দেশের মানুষের বৈচিত্র্যকে বিভাজনের কারণ হিসেবে না দেখে শক্তি ও সৌন্দর্যের উৎস হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন আদিবাসী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানভান্ডার বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে, যা সম্মান ও সুরক্ষার দাবি রাখে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’, যা আদিবাসীদের প্রথাগত অবদান ও অধিকার সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, "দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানভান্ডার দেশকে বৈচিত্র্যময় করেছে। এই বৈচিত্র্য দেশের সম্পদ ও অহংকার।"
উন্নয়ন ও সভ্যতার দোহাই দিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং তাঁদের ভাষা-সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। মালেকা বানু বলেন, "স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভূমিকা থাকলেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আদিবাসী নারীরা সামগ্রিকভাবে আরও নাজুক ও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছেন।"
মূলধারার নারী আন্দোলনের সঙ্গে আদিবাসী অধিকার আন্দোলন যুক্ত হলে তা আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, মানুষ হিসেবে সবাই সমান হলেও অধিকার, সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্য রয়ে গেছে। আদিবাসী, নারী কিংবা প্রান্তিক মানুষ—সব ক্ষেত্রেই এই সমস্যা বিদ্যমান। বাংলাদেশকে ‘রংধনু জাতি’র সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, দেশের সব জাতিসত্তার বৈচিত্র্যের মানুষগুলোকে মর্যাদা দেওয়া গেলে বাংলাদেশ আরও সুন্দর ও বর্ণময় হয়ে উঠবে।
সঞ্জিব দ্রং আরও বলেন, "বৈচিত্র্যের অনেক শক্তি, এটা মাথায় রাখতে হবে। বৈচিত্র্য কোনো হুমকি নয়। এটা যেন রাষ্ট্র যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা মাথায় রাখেন।"
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাং। তিনি অভিযোগ করেন, প্রাকৃতিক বন রক্ষায় আদিবাসীদের ভূমিকা এবং ভূমি ও পরিবেশ সংরক্ষণের ঐতিহ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। তাঁর মতে, মূলধারার সমাজে তাঁদের জ্ঞানের বৈচিত্র্যকে কখনো লালন বা ধারণ করা হয়নি।
ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, "এখনো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের জ্ঞান, খাবার, পোশাক—সবকিছুকেই এখনো অবহেলার চোখে দেখা হয়, অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবেও দেখা হয়।"
তিনি আদিবাসীদের জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে নতুন করে মূল্যায়ন করার দাবি জানান।
সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগ ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রোগ্রামে’র ডেপুটি টিম লিডার ক্যাথারিনা কোনিগ বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার সময় সাধারণত তাঁদের সমস্যা বা চ্যালেঞ্জের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁদের বিদ্যমান জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সংগঠিত হওয়ার পদ্ধতির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয় না। তিনি মনে করেন, অর্থবহ অংশগ্রহণের জন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জ্ঞান ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ ও প্রভাব থাকা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নীতিনির্ধারক ও বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহা তানজিম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী এবং কাপেং ফাউন্ডেশনের উজ্জ্বল আজিম প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রদর্শিত হয়।