অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গ বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল উষ্ণ অভ্যর্থনা। অনেকের সঙ্গে হাত মেলানো, সেলফি তোলা—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ৩৪ বছর বয়সী ওমর আরতান হয়তো মাস দুয়েক আগেও কল্পনা করেননি যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রাত্য হওয়ার পর ইউরোপ তাঁকে এভাবে বরণ করে নেবে।

বিশ্বকাপের সময়েই আলোচনায় এসেছিলেন সোমালিয়ার এই রেফারি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না পাওয়ায় বিশ্বকাপে রেফারিং করার সুযোগ হারান তিনি। কিন্তু একটি দরজা বন্ধ হতেই খুলে যায় অন্য একটি। ইতিহাসের প্রথম অ-ইউরোপীয় রেফারি হিসেবে উয়েফা সুপার কাপে পিএসজি ও অ্যাস্টন ভিলার ম্যাচে রেফারিং করার সুযোগ পেয়েছেন আরতান।

গত দেড় বছর আরতানের জীবন ছিল রোলারকোস্টারের মতো। আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল পরিচালনা করা প্রথম সোমালি হওয়া, ২০২৫ সালের বর্ষসেরা আফ্রিকান রেফারি নির্বাচিত হওয়া এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া—সব মিলিয়ে ছিল স্বপ্নের মতো এক অধ্যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না মেলায় বিশ্বকাপের সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না পারা সেই রেফারিকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিল সোমালিয়া।

ঠিক সেই সময়েই উয়েফা আরতানকে সুপার কাপের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানায়। উয়েফার ওয়েবসাইটে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে আরতান বলেন, ‘সময়টা খুব কঠিন ছিল। অনেকে সহানুভূতি দেখিয়েছেন। কারণ, এতগুলো বছর পরিশ্রম করার পর যখন কিছু করার কথা, আর তখনই সেটা করতে না পারা—এটা সত্যিই যন্ত্রণাদায়ক। তবে বিশ্বজুড়ে যে সমর্থন পেয়েছি, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’

প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই আরতানের পথচলা শুরু। অল্প বয়সে বাবাকে হারানো এবং মায়ের কাছ থেকে দূরে বড় হওয়া তাঁর জীবনের কঠিন বাস্তবতা। খেলোয়াড় হতে না পেরে রেফারি হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। পাড়ার মাঠ ও স্কুল ফুটবল থেকে শুরু করে সোমালি লিগে কাজ করার পর ২০১৮ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক তালিকায় জায়গা করে নেন। ২০২৪ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে রেফারিং করা প্রথম সোমালি হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি।

ইউয়েফা ও সিএফ-এর (আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন) মধ্যে এপ্রিলে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সূত্র ধরেই এই নিয়োগ এসেছে। আরতান একে দুই কনফেডারেশনের পারস্পরিক শেখার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ‘সিএফ রেফারিরা উয়েফা থেকে শিখতে পারে, আবার উয়েফা রেফারিরাও সিএফ থেকে।’

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সুখবরটি পান তিনি। নিজের ও পরিবারের জন্য একে ‘সত্যিকারের আনন্দের মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন আরতান। তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত ইউরোপ ও অস্ট্রিয়ার সোমালি সম্প্রদায়ও।

প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোনো খামতি রাখছেন না এই রেফারি। সোমালি লিগে খেলা পরিচালনা করার পাশাপাশি জুনের শেষে কুয়েত প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি সামলেছেন তিনি। দল বিশ্লেষণ এবং খেলার ধরন বোঝার কাজগুলো নিয়মিত তাঁর প্রস্তুতির অংশ।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি অনুপ্রেরণা দিয়ে আরতান বলেন, ‘আমি যদি পারি, যে কেউ পারবে। যা চান, তা-ই করতে পারেন। “স্বপ্ন দেখা কখনো বন্ধ করবেন না। রেফারি হতে চাইলে সেটাই সবচেয়ে ভালো কাজ—কেউ বাধা দিলেও থেমে যাবেন না। প্রতিদিন নতুন কিছু শিখুন, দক্ষতা শাণিত করুন।”’