বিশ্বকাপের রেশ কাটতে না কাটতেই ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে ফিরছে চেনা উত্তেজনা। ২০২৬-২৭ মৌসুম শুরুর আগে ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সের শীর্ষ পাঁচ লিগে কী পরিবর্তন এসেছে এবং কারা শিরোপার দাবিদার, তা নিয়ে পাঁচ পর্বের একটি ধারাবাহিক আয়োজন শুরু হচ্ছে। যার প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে ইতালিয়ান সিরি আ-র অন্দরমহল নিয়ে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের গত মৌসুমটি ইতালির ক্লাবগুলোর জন্য ছিল চরম হতাশাজনক। কোনো দলই শেষ ষোলোর বাধা অতিক্রম করতে পারেনি। লিগ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে নাপোলি। অন্যদিকে, নরওয়ের ক্লাব বোডো/গ্লিমটের কাছে ইন্টার মিলানের পরাজয় ছিল মৌসুমের অন্যতম বড় অঘটন। আতালান্তা নকআউট পর্বের প্রথম ধাপ পার করলেও শেষ ষোলোতে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে দুই ম্যাচে ১০ গোল হজম করে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।

এর পাশাপাশি জাতীয় দলের টানা বিশ্বকাপে খেলতে না পারার আক্ষেপ ইতালির ফুটবলের মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ২২ আগস্ট শনিবার পর্দা উঠতে যাচ্ছে সিরি আ-র ২০২৬-২৭ মৌসুমের।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিরি আ-তে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বেড়েছে। গত পাঁচ মৌসুমে তিনটি ভিন্ন দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সামগ্রিক মান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পয়েন্ট তালিকার লড়াই ছিল রোমাঞ্চকর। তবে নতুন মৌসুমে শিরোপা ধরে রাখার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইন্টার মিলান।

সিমোন ইনজাগির তৈরি করা শক্ত ভিতের ওপর ভিত্তি করে দলকে সামনে নিচ্ছেন কোচ ক্রিস্তিয়ান কিভু। দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ইন্টার এখনো অত্যন্ত ধারালো এবং সেরা ফর্মে থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে হারানোর ক্ষমতা রাখে তারা। তবে গত মৌসুমে দলের কিছু খেলোয়াড়ের ক্লান্তি পরিলক্ষিত হয়েছে। হাকান চালহানোলু, হেনরিখ মেখিতারিয়ান ও পিওত্র জিয়েলিনস্কিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের বয়স ৩০ ছাড়িয়েছে, ফলে গতি কমেছে। তা সত্ত্বেও দলবদলে গড় বয়স কমানোর তেমন উদ্যোগ নেয়নি ইন্টার।

সান সিরো ছেড়েছেন ডেনজেল ডামফ্রিস, স্টেফান দে ভ্রি, ফ্রান্সেসকো আচেরবি, মাত্তেও দারমিয়ান ও ইয়ান সোমার। নতুন হিসেবে যোগ দিয়েছেন ২১ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আলেকসান্দার স্তানকোভিচ। তবে সবচেয়ে বড় চমক ম্যানচেস্টার সিটি থেকে আসা ৩২ বছর বয়সী ইংলিশ ডিফেন্ডার জন স্টোনস। তাঁর অভিজ্ঞতায় ইন্টারের রক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইন্টার মিলানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে নাপোলি, যারা পাঁচ মৌসুমে তৃতীয়বারের মতো লিগ জয়ের সুযোগ পেতে চায়। কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাক্স আলেগ্রিকে, যা অনেকের কাছেই অবাক করার মতো। কারণ, গত মৌসুমে এসি মিলানের কোচ হিসেবে তিনি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। দলবদলে নাপোলি খুব একটা সক্রিয় না হলেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রাসমুস হইলুন্দকে স্থায়ীভাবে দলে নিয়েছে। এছাড়া চোট কাটিয়ে কেভিন ডি ব্রুইনারের ফেরা বড় স্বস্তি। তবে ট্রান্সফার উইন্ডো শেষ হওয়ার আগে আরও খেলোয়াড় চাইবেন আলেগ্রি।

অন্যদিকে, এসি মিলানের নতুন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন রুবেন আমোরিম। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ব্যর্থতার পর এটি তাঁর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। পিএসজি থেকে ৭ কোটি ৪০ লাখ ইউরোর ক্লাব রেকর্ড ফিতে গনসালো রামোসকে দলে এনে বড় বার্তা দিয়েছে রোজোনেরিরা। গত মৌসুমে ৩৮ ম্যাচে মাত্র ৫৩ গোল করা মিলানের আক্রমণভাগের দুর্বলতা রামোস কাটাতে পারবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শিরোপার লড়াইয়ে জুভেন্টাসও থাকবে। কোচ লুচিয়ানো স্পাল্লেত্তির এটি প্রথম পূর্ণ মৌসুম। গত মৌসুমে তাঁর কৌশলের প্রভাব দেখা গিয়েছিল। শীর্ষ চারে না থাকায় এবার ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার চাপ নেই জুভেন্টাস ও এসি মিলানের ওপর। তবে ইউরোপ ও লিগের ব্যস্ত সূচির কারণে স্কোয়াডের গভীরতা নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারে কোমো ও রোমা।

বিশেষ নজর রাখতে হবে কোমোর দিকে। কোচ সেস্ক ফ্যাব্রেগাসকে ধরে রাখতে পেরেছে তারা। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে নিকো পাজকে স্থায়ীভাবে নেওয়া এবং আলভারো মোরাতার যোগদানে তাদের আক্রমণভাগ শক্তিশালী হয়েছে। এবার শিরোপার লড়াইয়ে 'ডার্ক হর্স' হতে পারে কোমো।

অন্যদিকে রোমা, আতালান্তা, লাৎসিও, বোলোনিয়া ও ফিওরেন্তিনা মূলত ইউরোপীয় টুর্নামেন্টে জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকবে; তাদের লিগ জেতার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

সামগ্রিকভাবে, নতুন মৌসুমের হিসাব-নিকাশে ইন্টার মিলানই এগিয়ে। গ্রীষ্মকালীন দলবদলে কিভুর দল কিছুটা নিষ্ক্রিয় থাকলেও, তাদের টপকে অন্য কারও চ্যাম্পিয়ন হওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ কঠিন মনে হচ্ছে।