দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবেই দেখা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মতো বড় পরিবর্তন এলেও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক-রাজনৈতিক সক্ষমতার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব বহু ক্ষেত্রে স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশই বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতের প্রভাববলয়ের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চিত্র বদলানোর ইঙ্গিত মিলছে। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে যে পরিবর্তনের শুরু দেখা যায়, তা পরে বাংলাদেশ ও নেপালেও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থানের প্রেক্ষাপটে আরও স্পষ্ট হয়—বিশেষ করে জেনারেশন-জির (জেন-জি) ভূমিকা সামনে আসে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অবশ্য আলাদা গুরুত্ব পায়। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে, যেখানে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা কেন্দ্রীয় ছিল। আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং এরপর তিনি ও তাঁর দলের অনেক নেতা ভারতে আশ্রয় নেন।
এই ঘটনাপ্রবাহ অনেকের মধ্যে সেই পুরোনো ধারণা নতুন করে আলোচনায় এনেছে যে স্বাধীনতার পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে একটি ঘনিষ্ঠ কিন্তু নির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে রাখতে চেয়েছে। গত দেড় দশকে নাকি এই ধারণা আরও সুসংহত হয়েছিল। শেখ হাসিনার বহুল আলোচিত বক্তব্য, ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা সারা জীবন মনে রাখবে’—এই ভাবনাটি জনমনে নতুন করে জোরালো হয়েছে।
.অতএব, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে শুধু আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কৌশলের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। এটি ছিল একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম। ভারতের সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই সহযোগিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চালিকা শক্তি নয়।.
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বুঝতে হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু করতে হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ, যা বাঙালির জাতীয় চেতনার ভিত্তি গড়ে তোলে।
এর পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার আরও সংকুচিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে; ধাপে ধাপে স্বাধীনতার দাবির পক্ষে সমর্থন জোরালো হয়।
এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ভারত কৌশলগতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল—এমন ধারণা বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অনেকের মতে, ১৯৪৮ সাল থেকেই ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার সম্ভাব্য সুযোগ খুঁজছিল।
সম্প্রতি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী লোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, তাঁর দাদি ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে দেশটিকে বিভক্ত করেছিলেন। যদিও তিনি বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করেননি, তবু তাঁর বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
.এ প্রসঙ্গে ভারতের ভূরাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা ও গ্রন্থে বিশ্লেষণ এসেছে। এর মধ্যে শ্রীনাথ রাঘবনের ১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, অবিনাশ পালিওয়ালের ইন্ডিয়া’স নিয়ার ইস্ট, এবং এস জয়শংকরের দ্য ইন্ডিয়া ওয়ে—এসব বইয়ে ভারতের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও আঞ্চলিক স্বার্থের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানকে দুর্বল করে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে ভারত তার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহপ্রবণ অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও জোর পায়। ওই যুদ্ধে ভারত বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে; অরুণাচল প্রদেশের (তৎকালীন নেফা) কিছু অংশে ভারতীয় বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং আসামের তেজপুর শহর হুমকির মুখে পড়ে। নিরাপত্তা নীতিতে এই অভিজ্ঞতার প্রভাব গভীর বলে ধরা হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানও ভারতের জন্য ছিল একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর (যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত) উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থলসংযোগ। এই করিডরের নিরাপত্তা ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল; পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থান সেই নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারত। পাশাপাশি চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোর প্রতি পাকিস্তানের কথিত সমর্থন ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়ায়।
.অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, ভারতের সামরিক কৌশলগত বিবেচনায় এই বাস্তবতায় ‘আড়াই ফ্রন্ট’ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তাঁর বর্ণনায়, একদিকে ছিল চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে দুটি পূর্ণাঙ্গ ফ্রন্ট; অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগা ও মিজো বিদ্রোহ দমনে সামরিক বাহিনীর ব্যবহারকে তিনি ‘আধা ফ্রন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তান নাগা নেতা এ জে ফিজো এবং মিজো নেতা লালডেঙ্গাকে আশ্রয় দেয়। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মিজো বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যবহৃত হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৭১-এর পর এই কার্যক্রম মিয়ানমারে স্থানান্তরিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মিজোরামে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক রাষ্ট্রে রূপান্তরের ধারণা কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ করেনি, যদিও সেটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থায় ছিল—এমন মতও আছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওই পরিস্থিতি পরে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে সমান গুরুত্ব দেয়নি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল করা হয় এবং ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। এর ফলে বঞ্চনার অনুভূতি আরও তীব্র হয় এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী হয়।
.১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি হয়। রাজনৈতিক সংকট দ্রুত চরমে পৌঁছে এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এই সময় ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে—যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—পুরো প্রক্রিয়ায় ভারতের ভূমিকা কতটা কৌশলগত ছিল, আর কতটা মানবিক। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মানবিক সহায়তার পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই কারণে ভারত তার পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি কমাতে সক্ষম হয় এবং ‘আড়াই ফ্রন্ট’ পরিস্থিতি থেকে ‘দুই ফ্রন্ট’-এ নেমে আসে।
১৯৭১ সালের পর ভারত এই কৌশলগত সুবিধা দীর্ঘ সময় ধরে ভোগ করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে অসম ও একপক্ষীয় বলে সমালোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ এই ধরনের সম্পর্ককে আধিপত্যবাদী হিসেবে দেখে; ভবিষ্যতে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এটিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা হয়।
.বাংলাদেশ অবশ্যই ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। এমন কোনো সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদাকে খর্ব করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বাহ্যিক শক্তির দান নয়। এটি বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের ফসল। লাখ লাখ মানুষের রক্ত, নির্যাতন ও ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এই স্বাধীনতা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
অতএব, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে শুধু আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কৌশলের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। এটি ছিল একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের
সংগ্রাম। ভারতের সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই সহযোগিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চালিকা শক্তি নয়।
বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে তা হবে সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে—আধিপত্য নয়, সহযোগিতার ভিত্তিতে।
এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা।
মতামত লেখকের নিজস্ব