সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি সমাবেশের পর আদালতে একটি মামলা হয়েছে। নাছির চৌধুরীর স্ত্রী পারভীন আকতার মামলাটি করেছেন।
মামলার এজাহারে পারভীন আকতার অভিযোগ করেছেন, সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই ও শাল্লা) আসনের এমপি নাছির চৌধুরীর (৭৫) গলায় রামদা ধরে হুমকি দিয়ে তিন সৎভাই তাঁর বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের দলিলে সই নিয়েছেন। এজাহার অনুযায়ী, ওই সময় নাছির চৌধুরী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ এবং মানসিকভাবে অবুঝ ছিলেন।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (দিরাই আমলি আদালত) গতকাল সোমবার নাছির চৌধুরীর তিন ভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়। আদালতের বিচারক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলা ও আদালতের আদেশের বিষয়ে মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহিত লাল চন্দ।
এজাহারে পারভীন আকতার উল্লেখ করেন, নাছির চৌধুরী তখন স্ট্রোকে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়িসহ সম্পত্তি থেকে সৎভাইয়েরা বঞ্চিত হবেন—এমন আশঙ্কা থেকে এই সম্পদ নিজেদের নামে দলিল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তাঁর অভিযোগ, নাছির চৌধুরীর সম্পদ থেকে তাঁর দুই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে বঞ্চিত করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। এজাহার অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা থেকে অসুস্থ নাছির চৌধুরীকে দেখতে পারভীন আকতার দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে মারপিট ও শ্লীলতাহানির শিকার হন। পরে তাঁরা অসুস্থ নাছির চৌধুরীকে প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান শেলী চৌধুরী ও বোন শামীমা চৌধুরীর কাছে রেখে যান—এ দুজনও তখন অসুস্থ ছিলেন।
এজাহার আরও বলছে, এরপর আসামিরা ২৫ জানুয়ারি দিরাই সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দুই কর্মচারীকে কর্মকর্তা সাজিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। পারভীন আকতারের অভিযোগ, ওই সময় অসুস্থ ও মানসিকভাবে অবুঝ নাছির চৌধুরীকে দলিলে সই করতে বললে তিনি অসম্মতি জানান। পরে তাঁরা নাছির চৌধুরীর গলায় রামদা ধরে সই না করলে গলা কেটে হত্যার ভয় দেখান। এ সময় স্ত্রী শেলী চৌধুরী বাধা দিলে আসামিরা তাকেও হত্যার হুমকি দেন। পরে নাছির চৌধুরী দলিলে সই করেন।
মামলার এজাহারে পারভীন আকতার দাবি করেন, পরে তিনি এসে পুলিশের সহায়তায় নাছির চৌধুরীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান। সেখানে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর জোর করে দলিলে সই নেওয়ার বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়। এ নিয়ে পরে আলোচনা-সমালোচনা হলে আসামিরা ক্ষমা চান এবং দ্রুত দলিল বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে এজাহার অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তাঁরা কোনো উদ্যোগ নেননি। ঘটনার পরে শেলী চৌধুরী ও শামীমা চৌধুরী দুজনই মারা গেছেন।
অভিযুক্ত মঈন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পারিবারিকভাবে তাঁদের কিছু ঝামেলা আছে। মামলার বিষয়টি তিনি জানেন না। জানার পর আইনিভাবেই জবাব দেবেন।
নাছির চৌধুরী সুনামগঞ্জ-২ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। গত নির্বাচনের পর তাঁর ভাইদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ৬ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর উপলক্ষে দিরাই শহরে বিএনপি আয়োজিত এক সমাবেশে নাছির চৌধুরী বলেন, "আওয়ামী লীগ আমাদের শত্রু নয়, তারা মিত্র: বিএনপির এমপি নাছির চৌধুরী।" ওই সমাবেশের আগে তিনি আরও বক্তব্য দেন বলে তথ্য রয়েছে। এর এক দিন পর মঈন উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে দিরাইয়ে আরেকটি সমাবেশ হয়। এতে মঈন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্যকে একটি লুটেরা সিন্ডিকেট ঘিরে রেখেছে। তাঁরা এদের কবল থেকে নাছির চৌধুরীকে মুক্ত করতে চান।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।