বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাত, বিশেষ করে ই-গভর্ন্যান্স, আন্তঃকার্যক্ষমতা, ই-আইডি ব্যবস্থা এবং নিরাপদ তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এস্তোনিয়া। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।

সোমবার (১০ আগস্ট) এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিনে দুই দেশের দ্বিতীয় ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দ্বিপক্ষীয় (পূর্ব ও পশ্চিম) সম্পর্কবিষয়ক সচিব রাষ্ট্রদূত ড. এম নজরুল ইসলাম এবং এস্তোনিয়ার পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক প্রধান মাতি মুর্দ।

আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার নানা সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয় এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই লক্ষ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পারস্পরিক সফর এবং সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয় উভয় পক্ষ। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ওষুধশিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাতের বৈশ্বিক সক্ষমতা তুলে ধরে।

এস্তোনিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর এবং এস্তোনিয়ার বেসরকারি খাতের একটি অনুসন্ধানী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ আইটি পেশাজীবী, প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ দক্ষ জনশক্তির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ কর্মসূচির আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি, কেয়ারগিভিং, নির্মাণ, আতিথেয়তা ও পর্যটন, কৃষি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়, যা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছে এস্তোনিয়া।

ডিজিটাল খাতের সহযোগিতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, আন্তঃকার্যক্ষমতা, ই-আইডি ব্যবস্থা, নিরাপদ তথ্য বিনিময়, উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। এস্তোনিয়া জানায়, তারা বাংলাদেশের ই-গভর্ন্যান্স খাতে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। দেশটির বেশ কয়েকটি ডিজিটাল কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

শিক্ষা, ক্রীড়া, বৃত্তি, গবেষণা, শিক্ষার্থী ও যুব বিনিময়, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সংস্কৃতি, পর্যটন, দ্বৈত কর পরিহার, বিনিয়োগের প্রসার ও সুরক্ষা এবং শিল্প খাতের সহযোগিতাসহ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানায় এস্তোনিয়া এবং তার মেয়াদে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেয়।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচনে একে অপরের প্রার্থিতাকে সমর্থন করার বিষয়ে একমত হয় দুই দেশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে এস্তোনিয়া। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এস্তোনিয়া।

এদিকে, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ন্যাটো ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি কারিন মান্দির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।

দুই দেশের প্রতিনিধিদল মনে করে, এই দ্বিতীয় ফরেন অফিস কনসালটেশন ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও যোগাযোগ আরও জোরদার করবে। পরবর্তী অর্থাৎ তৃতীয় দফার ফরেন অফিস কনসালটেশন পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে ঢাকায় আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।