ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিশ্ব ফুটবলে বিদ্রোহ আরও তীব্র হয়েছে। এবার সরাসরি তার পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফ। একই সঙ্গে ফিফার বাইরে বিকল্প কোনো প্রতিযোগিতা আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে এই তিন কনফেডারেশন।
ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত 'ফুটবল ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' বা এফএফই পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের মুখে সোমবার একটি যৌথ খোলা চিঠি দেয় তারা। ওই চিঠিতে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে আস্থা ভাঙার অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে এমন নেতৃত্বের আহ্বান জানানো হয়েছে, "যারা ফুটবলের সেবা করবে, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে না।"
যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন, এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা এবং কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্টাগলিয়ানি। তাদের মতে, ফুটবলের নেতৃত্ব কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, "একজন নেতা যখন নিজেকে তার ওপর দায়িত্ব দেওয়া সামষ্টিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে নিয়ে যান, তখন তিনি নিজের দায়িত্ব থেকে সরে আসেন।"
অভিযোগ উঠেছে, ইনফান্তিনোর এফএফই পরিকল্পনায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বিনিয়োগকারীদের কাছে ফিফা ও বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বার্থের অংশ তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এগিয়ে নেওয়া হয়। তীব্র বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিল করতে বাধ্য হন তিনি। পরবর্তীতে মরক্কোর রাবাতে ফিফার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেও তিন কনফেডারেশনের দাবি, ফিফা বিষয়টিকে কেবল যোগাযোগের ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, অথচ এটি ছিল নেতৃত্ব ও বিচারবোধের বড় ব্যর্থতা।
সেফেরিন, শেখ সালমান ও মন্টাগলিয়ানি এই কেলেঙ্কারির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের চাওয়া, ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দিয়ে এই তদন্ত করাতে হবে। তবে ফিফা এর আগে জানিয়েছিল, পরবর্তী কাউন্সিল সভায় এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।
নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে সদস্য দেশগুলো ফিফার আর্থিক সহায়তা হারাতে পারে—এমন প্রচারের বিষয়ে যৌথ চিঠিতে জানানো হয়েছে, "কোনো সদস্য সংস্থাকে তার প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নয়।"
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকির পাশাপাশি বিকল্প টুর্নামেন্ট আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে তিন কনফেডারেশন। এই বিরোধের সমাধান না হলে আগামী মাসের অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ ইউরোপের দলগুলো ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে পারে।
এদিকে ইনফান্তিনোর বিকল্প প্রার্থী খোঁজার তৎপরতাও বেড়েছে, যেখানে কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্টাগলিয়ানিকে অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় ফিফা সভাপতি নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা ঘোষণা করতে হবে।
তবে উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফের শীর্ষ নেতৃত্ব একমত হলেও সব সদস্য দেশের অবস্থান এক নয়। ইউরোপের বাইরে খুব অল্প কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করেছে এবং খুব কম সদস্য সংস্থাই সমর্থনপত্র প্রত্যাহার করেছে। অন্যদিকে, আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন ও দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি প্রভাবশালী ফুটবল সংস্থা এফএফই পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে বৈঠকের অনুরোধ করলেও এখনো কোনো উত্তর পায়নি।
একসময় ইউরোপকেন্দ্রিক মনে হওয়া এই আন্দোলন এখন এশিয়া ও কনকাকাফ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায়, পদত্যাগ না করলেও বিশ্ব ফুটবলে নিজের কর্তৃত্ব ধরে রাখা ইনফান্তিনোর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।