জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিয়ুবের ওপর দৃশ্যমান হচ্ছে। নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় তলদেশে চাপা পড়ে থাকা বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের দেখা মিলছে। জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটি বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতলীকরণের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া ডজন খানেক যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ এখন দৃশ্যমান। এছাড়া বুলগেরিয়ায় প্রায় ৪ হাজার বছর আগে ইউরোপ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া উলি ম্যামথের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। পানিসংকটের এই চরম পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির পরমাণু চুল্লিগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা এবং দাবানলের কারণে নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালান বলেন, "জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলমান এই চরম পরিবেশগত অবস্থা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ক্রমশ জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।"
তিনি আরও জানান, মে মাসের শেষ থেকে পশ্চিম ইউরোপ ঘন ঘন তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। এই অঞ্চলে রেকর্ড উষ্ণতম জুন মাস পার করার পর জুলাইয়ে তাপমাত্রা আরও তীব্র হয় এবং বর্তমানে পশ্চিম ইউরোপ পুনরায় তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে।
স্যাটেলাইটের তথ্যে দেখা গেছে, ইউরোপের চারটি প্রধান নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের সোমুরের কাছে লোয়ার নদী, ইতালির ক্রেমোনার কাছে পো নদী, জার্মানির বোপার্ডের কাছে রাইন নদী এবং হাঙ্গেরির পাকসের কাছে দানিয়ুব নদী অন্যতম। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের পানি নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান লিজ সাকোচিয়া বলেন, "রাইন ও দানিয়ুব নদীর মতো বড় নদীগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ। এগুলো শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পানির উৎস। পানির স্তর কমলে এর প্রভাব জলপথ ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে।"
নদীর পানি কমে যাওয়া পরিবেশগত সংকটের ইঙ্গিত দিলেও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অনুসন্ধানী গবেষক জোল্ট হরভাথ জানান, শক্তিশালী চৌম্বক ব্যবহার করে নদীর শুকনা পাড় থেকে একটি পুরোনো রেডিও অ্যাম্প্লিফায়ার ও বুলেটের খোলস উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বুলগেরিয়ার দানিয়ুব তীরের বাসিন্দারা এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে গিয়েছেন; তাঁরা প্রায় ৪ হাজার বছর আগের উলি ম্যামথের চোয়ালের হাড়, দাঁত, কাঁধের হাড়ের অংশসহ ঊরুর হাড় উদ্ধার করেছেন।