মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় (এসএসসি) রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম। এর আগের বছর ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
পূর্ববর্তী বছরগুলোর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৯০ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৫২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪৪ জন এবং অনুপস্থিত ছিলেন ২ হাজার ৯০৮ জন। উপস্থিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১ লাখ ১২ হাজার ৮৬ জন।
পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালে রাজশাহী বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৬ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী, যার মধ্যে ছাত্রী ৮ হাজার ৯১১ জন এবং ছাত্র ৭ হাজার ২০২ জন। অথচ ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ২২ হাজার ৩২৭ জন। এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৬ হাজার ২১৪ জন।
লিঙ্গভিত্তিক ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৯টি থাকলেও ২০২৬ সালে তা কমে ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পাঁচটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি এবং ১১টি বিদ্যালয়ের পাসের হার ১০ শতাংশের নিচে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পাসের হার কমে যাওয়া কেবল পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া নয়, বরং শ্রেণিকক্ষে শেখার প্রক্রিয়ার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ, মৌলিক ধারণার অভাব এবং পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির ঘাটতি এই ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে তারা মনে করেন। তাদের মতে, এটি মেধাবী শিক্ষার্থীর হ্রাস নয়, বরং উচ্চমানের প্রস্তুতির অভাব। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার চেয়ে বিশ্লেষণধর্মী ও প্রয়োগভিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন, যেখানে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়া বিদ্যালয়গুলোর ফলাফলের পার্থক্য প্রমাণ করে যে সব প্রতিষ্ঠানে সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না; অনেক জায়গায় শিক্ষক সংকট ও তদারকির দুর্বলতা রয়েছে।
এই ফলাফলকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তারা পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, "পাসের সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার্থীদের মেধাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেধার গুরুত্ব কমে যাওয়ায় পাসের হারও কমেছে। যে পাঁচ স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী পান করেনি সেসব স্কুল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হবে।"