তিনটি ভিন্ন ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন। তাঁর জীবনের প্রথম পর্যায় শুরু হয় কলকাতা আর্ট স্কুলে, যদিও এন্ট্রান্স পাস না করেই সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তিন বছর পর সেখান থেকে বেরিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে ভবঘুরের মতো জীবন কাটান। প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পের নিজস্ব ভুবনে নিজেকে নিবেদন করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য।

চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে তাঁর সৃজনশীলতার সবটুকু আমরা জানি না, তবে জীবিকার তাগিদে তাঁকে নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছিল। শিল্পচর্চায় তিনি পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুসরণ না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শিল্পরীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।

সাতচল্লিশের দেশভাগের পর শুরু হয় সুলতানের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ধীরে ধীরে কিংবদন্তিতে পরিণত হন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আমেরিকা ও ইউরোপ ভ্রমণ তাঁর শিল্পভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করে। পশ্চিমা শিল্পীদের কাজ দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজস্ব শিল্পভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত প্রচলিত ব্যাকরণের বাইরে গিয়ে মাটির মানুষের কৃষিসভ্যতাকে তিনি তাঁর সৃষ্টির মূল উপজীব্য করেন, যা তাঁকে এনে দেয় আকাশচুম্বী সাফল্য।

এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনের তৃতীয় ও সবচেয়ে আলোড়নময় অধ্যায়। নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে স্নিগ্ধ বেণিগাঁথা গ্রামের মাছিমদিয়ায় তিনি বসতি গড়েন। "সেই গ্রামের বুকের ভেতর থেকেই উঠে এসেছে শিল্পী সুলতানের পুরোনো, পরিত্যক্ত বাড়িটি। চিত্রা নদীর কলতান আর মাছিমদিয়ার মাটির সঙ্গে একান্তভাবে মিশে বেড়ে উঠেছিলেন এই শিল্পী।"

১৯৭৮ সালের নভেম্বরে প্রথমবার ছবি তুলতে গিয়ে লেখক লক্ষ্য করেন, বিশ্বখ্যাত এই শিল্পীর বাড়ির চারদিকে এক অদ্ভুত হাহাকার। দেয়ালে কোনো সাজানো ছবি নেই, বরং পাটের দড়িতে টাঙানো জরাজীর্ণ কাপড়ের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে বিবর্ণ এক নারীর মুখ। আসবাবহীন সেই বাড়িতে বেডরুম, স্টুডিও বা পাকঘরের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন নেই। নড়াইল জমিদারবাড়ির প্রায় দেড় শ বছরের পুরনো এই দোতলা ভবনটি ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। সিঁড়ি ভেঙে পড়ার উপক্রম, ছাদের ছিদ্র দিয়ে দেখা যায় খণ্ডিত আকাশ। বিদ্যুৎ বা পানির কোনো সুব্যবস্থা ছিল না সেখানে।

বিস্ময়কর বিষয় ছিল, এই শেওলাধরা বাড়িতে শিল্পীর সঙ্গে বসবাস করত শত শত প্রাণী। বড় টিকটিকি, ধাড়ি ইঁদুর এবং প্রায় দেড় ডজন বিড়াল স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত। এছাড়া ছিল প্রভুভক্ত কিছু কুকুর। লেখক স্মৃতিচারণ করে বলেন, "দোতলার যে ঘরে আমাকে ঘুমানোর জায়গা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে পাটির ওপর জামাকাপড়, মোজা ও মাথায় উলের টুপি পরে তীব্র শীতেও ঘুমানোর ভান করতাম।"

এক রাতে লেখক লক্ষ্য করেন, "হারিকেনের মৃদু আলোয় তন্দ্রাচ্ছন্ন এক রাতে হঠাৎ সুলতান এসে ঢুকলেন। মধ্যরাতে আচমকাই জীবজন্তু ও পাখিদের কণ্ঠস্বর প্রায় স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো, কেউ একজন এসেছে ওদের সঙ্গে দেখা করতে।"

সুলতান খাঁচায় থাকা প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং প্রাণীরাও যেন শব্দে সাড়া দিত। লেখক লক্ষ্য করেন, পশুপাখিদের প্রতি তাঁর অসীম মমতা। একবার প্রাণীদের উদ্দেশ্যে সুলতান বলেছিলেন, “আজ তোরা অভুক্ত, কালকে খেতে দেব। ঢাকা থেকে মেহমান এসেছে, ওকে ডিস্টার্ব করিসনে।”

পরের বছর ডিসেম্বরে পুনরায় মাছিমদিয়ায় গিয়ে লেখক দেখেন একই দৃশ্য। সুলতান বাজার থেকে শাকসবজির অপ্রয়োজনীয় পাতা ও ডাঁটা কিনে এনে মেঝেতে বসে কুচি কুচি করে কেটে পশুপাখিদের খেতে দিচ্ছিলেন। বাড়ির ভেতরে ৪ ফুট বাই ৮ ফুটের অনেকগুলো পেইন্টিং ছিল, যা বিরূপ আবহাওয়া ও উইপোকার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭৬ সালের একক প্রদর্শনীর অবিক্রিত ছবিগুলো সেখানে পড়ে ছিল। এর মধ্যে ‘চর দখল’ শিল্পকর্মটির কিছু অংশ ফুটো হয়ে গিয়েছিল। লেখক সেই আইকনিক ছবিগুলোর ছবি তোলেন। তাঁর অনুভূতি ছিল, "ছবি তুলতে গিয়ে মনে হচ্ছিল পেশিবহুল মানুষগুলো সুলতানের ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সুলতান পাশে দাঁড়ানো রয়েছে, তাঁর আঁকা ছবির মানুষেরা যেন তাঁর দিকে দৃষ্টি বিনিময় করতে থাকে। ছবিগুলো বাগানে রোদ পোহাতে থাকে।"

দুপুরের খাবারের সময় পাতলা ডাল, কুড়িয়ে পাওয়া শাকের ভাজি ও মোটা চালের ভাত মাটিতে বসে খাচ্ছিলেন সুলতান ও লেখক। সেই সময় বিড়ালগুলো প্লেটের সামনে চলে এলে সুলতান বলেন, “আজকে তোদের খেতে দিতে পারিনি, কালকে দেব। মেহমানকে খেতে দে।” লেখক সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করে বলেন, "কথাগুলোর অর্থ বিড়ালরা বুঝতে পারল। এমন দৃশ্য ধরে রাখার জন্য পাশে বসা আমি এঁটো হাতে ক্যামেরার শাটারে চাপ দিই। বিড়াল ও মানুষের ক্ষুধার এক মায়াবী ইতিবৃত্ত ছবিতে ধরা পড়ে।"

কয়েক দশক পর সেই ছবিগুলো এখন কেবল একজন বিশ্বমানের শিল্পীর ব্যক্তিগত স্মারক নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে শিল্পী ও আলোকচিত্রীর এক বিরল সহযাত্রার সাক্ষ্য হয়ে আছে।