দীর্ঘ এক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে (সার্ক) পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের পর থেকে এই জোটের আর কোনো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং নতুন কোনো চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়নি।
বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের আবাসস্থল এই সার্কভুক্ত দেশগুলোতে। বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্ক পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করার কথা জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনের সাইডলাইনে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের চেষ্টা চলছে। এছাড়া শীর্ষ নেতাদের একান্ত বৈঠকেও এই বিষয়টি উত্থাপন করবে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সার্ক যে সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেদিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। গেল এক দশকের বেশি সময় ধরে শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা যায়নি। এর ফলে সার্কের গতি সঞ্চার হচ্ছে না।’
সার্কের প্রধান সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে রাজনৈতিক উত্তেজনাকে, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ এই জোটকে কার্যত অচল করে রেখেছে। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও উরি হামলার পর ভারত অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয় না। পরবর্তীতে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটানও একই অবস্থান নেয়, যার ফলে শীর্ষ পর্যায়ের কার্যক্রম থমকে যায়।
তবে রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলন না হলেও কর্মকর্তা পর্যায়ে যোগাযোগ নিয়মিত চলছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে সার্কভুক্ত দেশগুলোর একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৮৫ সালে ঢাকায় যাত্রা শুরু করা সার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে সার্ক সক্রিয় হলে আঞ্চলিক ট্রানজিট, বিদ্যুৎ বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, পর্যটন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার ভূমিকা আরও জোরালো হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘নিঃসন্দেহে সার্কের অপার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সার্কে মুক্তবাণিজ্য চালুর চেষ্টা হয়েছিল। একসময় ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। এখনও তা আছে।’ উল্লেখ্য, ভৌগোলিক নৈকট্য ও বৃহৎ বাজার থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম কম আঞ্চলিক বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে বিমসটেক অধিক সক্রিয় হলেও অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, এটি সার্কের বিকল্প নয়। কারণ সার্কের ভৌগোলিক পরিসীমা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিমসটেক থেকে ভিন্ন।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহামারির মতো ঝুঁকিগুলো এককভাবে মোকাবিলা করা অসম্ভব। নদী ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনস্বাস্থ্য খাতে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা সরিয়ে এসব ক্ষেত্রে কাজ শুরু করলে সার্ক নতুন গতি পেতে পারে।
অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘অরাজনৈতিক বিষয়ে ঐকমত্য সম্ভব। অরাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে সার্ক যাত্রা শুরু করেছিল। পৃথিবীর অনেক দেশ অরাজনৈতিক বিষয় দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। সার্কে এটা সম্ভব হয়নি কারণ আঞ্চলিক নেতৃত্বের অভাব, এই অঞ্চলের বিরোধপূর্ণ পরিবেশ এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতা।’
তবে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার কারণে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতি ছাড়া সার্কের পূর্ণাঙ্গ পুনরুজ্জীবন কঠিন হবে। শেষ পর্যন্ত এই জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর।
অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আমরা পিছিয়ে আছি। সার্ক যত অকার্যকর থাকবে, এই অঞ্চলের জন্য ততই ক্ষতি। ফলে এই জোটের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্কে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।’