কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নারী চিকিৎসক ‘অভয়া’র ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট রাতে হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে ৩১ বছর বয়সী ওই নারী চিকিৎসক ধর্ষণের পর নিহত হন। পরদিন ১০ আগস্ট ভোরে হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই শোকাবহ ঘটনার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে কলকাতায় বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বেলা ১১টায় রাজ্যের সকল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে দুই মিনিট নীরবতা পালন এবং তাঁর স্মৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া বিকেলে উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিহাটির লোকসংস্কৃতি ভবনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং নিহত চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৯ আগস্টের সেই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতার রাজপথে নেমে হাজারো মানুষ, বিভিন্ন সংগঠন এবং চিকিৎসক সমাজ এই নৃশংসতার প্রতিবাদ জানান।
ঘটনার পরদিন পুলিশ হাসপাতালের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি শিয়ালদহের দায়রা আদালত সঞ্জয় রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে বিচার চলাকালীন সঞ্জয় রায় বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতে বলেন, “তিনি ধর্ষণ বা হত্যার সঙ্গে জড়িত নন; তাঁকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে।”
আদালতের এই রায়ে সন্তুষ্ট নন নিহত চিকিৎসকের মা-বাবা। তাঁদের অভিযোগ, মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ বিচার হয়নি। এই কারণে তাঁরা মামলাটির পুনর্তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন।
এদিকে মামলার তদন্তে নতুন করে তৎপর হয়েছে সিবিআই। তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে সন্দীপনী গর্গকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন তদন্ত দল বর্তমানে মামলার নথিপত্র এবং পূর্ববর্তী তদন্তের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছে।
নিহত চিকিৎসকের পরিবারের আইনজীবী অমর্ত্য দে অভিযোগ করেছেন, মামলায় তৎকালীন পানিহাটির তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষের ভূমিকা নিয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও আগের তদন্তে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। নতুন তদন্ত শুরু হওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
এর আগে নিহত চিকিৎসকের মা আগের তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত না করার অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। পাশাপাশি, বিজেপির সংসদ সদস্য ও সাবেক বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় গত মে মাসে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ তুলে আগের তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছিলেন।
নতুন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন নিহত চিকিৎসকের পরিবার। উল্লেখ্য, আর জি কর মামলায় সিবিআইকে আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টে স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পশ্চিমবঙ্গের জনমনে এই ঘটনাটি এখনও গভীরভাবে আলোচিত এবং সবাই এখন নতুন তদন্তের অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে আছেন।