সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাবেক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ পাকিস্তানকে নিয়ে কটাক্ষ ও সমালোচনা করেছেন বলে বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তিনি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে ব্যঙ্গ করেন এবং নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরবকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে দেশটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আবদুলখালেক আবদুল্লাহ লিখেছেন, এটি ‘সময়ের এক অদ্ভুত পরিহাস’। তিনি বলেন, যে দেশের ‘এক-চতুর্থাংশ মানুষ দরিদ্র’ এবং ‘এক-তৃতীয়াংশ মানুষ’ নিরক্ষর, সেই দেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতির একটি দেশকে রক্ষা করার অবস্থানে নিজেকে ‘সুবিধাবাদী’ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে আবদুল্লাহ আরও বলেন, পাকিস্তান ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক শাসন, দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুদ্ধে ভুগেছে’। দেশটির একমাত্র প্রধান যোগ্যতা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন তাদের ‘১৭০টি পারমাণবিক বোমা’।

সাবেক এই উপদেষ্টা মূলত পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যকার ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’–এর দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আবদুল্লাহর এই মন্তব্য পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া বৃহত্তর ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়েও আমিরাতের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তিকেই প্রকাশ্যে এনেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবদুল্লাহর এই পোস্ট ১০ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ১৬ লাখ পাকিস্তানি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করেন এবং তাঁরা পাকিস্তানের প্রবাসী আয়ের অন্যতম বড় উৎস।

ওআইসির সংস্থা ‘ইসেসকো’র সাবেক প্রধান আবদুলআজিজ আলতোয়াইজরি আবদুল্লাহর পোস্টের জবাবে ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন, ‘যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে জায়নবাদীদের সঙ্গে হাত মেলাবে, তারা কখনোই নিরাপত্তা খুঁজে পাবে না।’ পাকিস্তানের পোস্টের পর তিনি আরও যোগ করেন, ‘মনে হচ্ছে মক্কা চুক্তি সিনড্রোম আপনাকে দিশাহারা করে ফেলেছে।’

বিশ্লেষকেরা মক্কা চুক্তিকে মূলত ইউএই-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতার একটি পাল্টা জবাব হিসেবে দেখছেন। প্রথম উপসাগরীয় দেশ হিসেবে আমিরাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন চাপ সত্ত্বেও সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। তা ছাড়া দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আবুধাবির সমর্থনের কারণেও সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডোর সিঙ্গার মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘প্রথম দেখায় ইউএই-ইসরায়েল জোটকে উভয় পক্ষের জন্যই বেশি লাভজনক মনে হতে পারে। তবে দিন শেষে মক্কা চুক্তি আরও বড় পরিসরে এবং কোনো ধরনের বৈষয়িক লেনদেনের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।’

গত মে মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চরম মুহূর্তে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আবুধাবি সেই বক্তব্য অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে মক্কা চুক্তিটি বেশ খোলামেলা ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের যুবরাজ প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র নগরী মক্কায় একসঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেছেন।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, তিনটি দেশ প্রকাশ্যে এই চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কারণে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু ইউএই-ইসরায়েল জোটের ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা সম্ভব হবে না।