কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধ করার লক্ষ্যে রাশিয়ার কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইউক্রেন। প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ও রাশিয়া—উভয় পক্ষই এই অঞ্চলে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে।
সম্প্রতি ওই অঞ্চলের জাহাজ ও বন্দরগুলোতে একের পর এক হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই উদ্বেগ থেকেই কিয়েভ এই উদ্যোগ নিয়েছে। রয়টার্সকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র, তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে ইউক্রেন মস্কোর জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ দুই কৃষিপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। সম্প্রতি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ব্যবহৃত জাহাজে হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং "রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ দুই কৃষিপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। সম্প্রতি এমন পণ্য রপ্তানিতে ব্যবহৃত জাহাজে হামলা বেড়ে গেছে। আর এসব হামলার জন্য দুই দেশই একে অপরকে দোষারোপ করেছে।"
রাশিয়ার হামলার আশঙ্কায় জুলাইয়ের শেষ দিকে অনেক জাহাজমালিক ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের ওডেসার বন্দরগুলোতে জাহাজ পাঠানো বন্ধ করে দেন। ওডেসায় রুশ হামলায় বেশ কিছু জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তারা এই সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে কিয়েভ বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের হামলার পর গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার কৃষ্ণসাগরের নভোরোসিস্ক বন্দরের তিনটি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় রাশিয়া। এতে রাশিয়ার শস্য রপ্তানি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইউক্রেনের এই প্রস্তাবের বিষয়ে ক্রেমলিন বা রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার গ্রুশকো জানিয়েছেন, কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মস্কোর কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব আসেনি। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে তিনি বলেন, "সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের স্থগিতাদেশ ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব ধারণা সামনে আনা হলেও রাশিয়া আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব পায়নি।"
ইউক্রেনের প্রস্তাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার ইউরোপের বাজারে গমের দাম কিছুটা কমেছে, যা এর আগে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করার পর থেকেই দেশটির অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বন্দর ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি কমাতে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য কৃষ্ণসাগর দিয়ে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়। তবে ২০২৩ সালে রাশিয়া ওই চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানায়।
পরবর্তীতে ইউক্রেন নিজস্ব উদ্যোগে একটি সমুদ্রপথ চালু করে, যা সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আগ পর্যন্ত সচল ছিল। কিয়েভ জানিয়েছে, বিকল্প হিসেবে রেলপথ ও দানিউব নদীপথ ব্যবহার করলেও সেগুলোর সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এদিকে, কৃষ্ণসাগরে জাহাজ ও বন্দরে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। দেশটি উভয় পক্ষকেই হামলা বন্ধে একটি স্থগিতাদেশ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে।
বন্দরগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আগস্টের প্রথম ভাগে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কৃষি খাতের সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউক্রেনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে এবং রাশিয়ার নিহতের সংখ্যা ৪,৫০,০০০ জনে পৌঁছেছে।