বন্যার সময় বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবন রক্ষা, ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং দুর্গম চরাঞ্চলে জরুরি সহায়তার লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল আধুনিক উদ্ধারকারী বোট। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই নীলফামারীর ডিমলায় সেই বোটগুলো এখন নিজেই উদ্ধারের অপেক্ষায় পড়ে আছে। তিনটি বোটের একটির অর্ধেক অংশ তিস্তার পানিতে তলিয়ে গেছে এবং বাকি দুটিও দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি অচল। কোথাও ইঞ্জিন নষ্ট, কোথাও পাটাতন ভাঙা, আবার লোহার অংশে ধরেছে মরিচা। এমনকি বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রাংশ উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উদ্যোগে সারা দেশে ৬০টি আধুনিক উদ্ধারকারী বোট কেনা হয়। প্রতিটির দাম ছিল ৮৮ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে নীলফামারীর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় তিনটি—ডিমলার দোহেলপাড়া ও ঝুনাগাছ চাপানি এলাকায় দুটি এবং জলঢাকার ডাউয়াবাড়ী ঘাটে একটি। তিনটি বোট কিনতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকারও বেশি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডিমলার ঝুনাগাছ চাপানি ঘাটে রাখা একটি বোটের বড় অংশ তিস্তার পানিতে ডুবে রয়েছে। দীর্ঘদিন পানিতে পড়ে থাকায় বোটের বিভিন্ন অংশে ক্ষয় ও মরিচা ধরেছে। অন্য দুটি বোটও অচল অবস্থায় পড়ে আছে; কোথাও পাটাতন ভেঙেছে, আবার কোথাও লোহার অংশ ক্ষয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বোটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের কিছু অংশ ইতোমধ্যে উধাও হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বোটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি অর্থে কেনা কোটি টাকার এসব সম্পদ এখন ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। এতে দুর্যোগের সময় এসব বোট আদৌ কোনো কাজে আসবে কি না, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হালিম বলেন, “বন্যার সময় এসব বোট দেখলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হতো। এখন বোটগুলোই যদি অচল হয়ে পেছনের দিকে পচে নষ্ট হয়, তাহলে দুর্যোগের সময় বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার করা হবে কীভাবে?”

কিসামত চর গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, “মানুষের জীবন রক্ষার জন্য যে বোট কেনা হয়েছিল, সেটিই যদি নদীর পানিতে পড়ে নষ্ট হয়, তবে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?”

স্থানীয় কৃষক আরিফ ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারি সম্পদ কেনার পর তা ফেলে রেখে নষ্ট হতে দেওয়া জনগণের স্পষ্ট অপচয়। এ বিষয়ে দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।”

এদিকে বোটগুলোর দায়িত্বে থাকা চালকরা প্রায় ১৭ মাস ধরে বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। চালক রুবেল ও জাভেদ জানান, বোট সচল না থাকলেও তাদের নিয়মিত পাহারা ও দেখভাল করতে হয়। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম না থাকায় দায়িত্ব পালন করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর সংস্কারের কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় কোনো কাজই করা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বোটের যন্ত্রাংশ উধাও হওয়ার অভিযোগ ঘিরে। সরকারি সম্পদ হিসেবে কেনা এসব বোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কীভাবে হারিয়ে গেল এবং সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি চেয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান সরকার বলেন, “বন্যাপ্রবণ এই এলাকায় উদ্ধারকারী বোট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বোটগুলো সচল থাকলে বন্যার সময় মানুষ ও মালামাল উদ্ধার এবং ত্রাণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া বোটগুলো মেরামত করে পুনরায় চালু করা দরকার।”

এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জানি না। প্রকল্প চলাকালে হয়তো সংস্কারের বরাদ্দ ছিল, তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কোনো তহবিল নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”