সাঁওতাল পাড়ার ছেলে হিসেবে বাংলা কবিতা পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ নেই। আমি জানি না, জসীমউদ্দীন নামে কোনো কবি ছিলেন কি না। শচীন দেববর্মনের গানও আমাকে আকৃষ্ট করে না। ছায়ানটে মাদল বাজে না, বকুলতলার উৎসবে সাঁওতালদের বিলুপ্তির কথা কেউ বলে না। আমাদের জন্য সাঁওতাল বিষয়টি গুরুত্বহীন। পেটের ক্ষুধা মেটাতে, বিস্তীর্ণ মাঠে খরগোশের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে পূর্বপুরুষের জীবন চলে গেছে, কিন্তু আমাদের ক্ষুধা কি মিটেছে? বেঁচে থাকতে হলে ক্ষুধা লাগে। আমরা জানি, কিন্তু বলতে পারি না, বাঙালিরা সাঁওতালদের ধরে ধরে খেয়েছে। আমাদের খড়ের ঘরে আগুন দেয় ইউনিফর্মড পুলিশ, আর আমরা পুড়তে থাকি। এই শ্রাবণে এত বৃষ্টি, সাঁওতাল পাড়া পুড়তে থাকে, আমাদের পোড়াভস্ম কখনো বাংলা কবিতা দেখতে পায় না। কবিরা অন্ধপ্রায়, কেউ কেউ আমাদের ঘরের মাটির দেয়ালে আঁকানো আলপনার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে যায়। আলপনা কি সাঁওতালদের হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে টিকিয়ে রাখার নকশাচিত্র? আমি সাঁওতাল পাড়ার ছেলে, বাংলা শ্রাবণ বুঝব না, রবীন্দ্রনাথ বুঝব না। কারণ সাঁওতাল মায়েদের চোখে সারা বছর অশ্রুপাত হয়। সাঁওতাল বাবাদের পাঁজর ক্ষতচিহ্নের মানচিত্র হয়ে আছে। সেই ক্ষতাক্ত মানচিত্রই আমাদের, আমার অপহৃত দেশ—এ ট্র্যাজেডি রেড ইন্ডিয়ানদের মুখস্থ, কিন্তু বাঙালি জানে না। তারা আমাদের পাড়ার সবচেয়ে সুন্দর মোরগটি ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে খায়। তারা জানেই না, মোরগ আমাদের দেবতা। সাঁওতাল শিশুরা কখনো আকাশে উড়ে না, এমনকি শিশুপার্কেও আসে না, কিন্তু ক্ষুধা লাগে বলে তারা মাঠ-দিগন্তে খরগোশের পেছনে ছুটতে থাকে। রাত গভীর। সাঁওতাল পাড়ায় মাদল বাজছে—সেই হাহাকার কি তরুণ কবি শুনতে পাচ্ছে? বনের ধারে শাক তুলতে যাওয়া এক সাঁওতাল কিশোরীকে তিন দিন আগে অপহরণ করা হয়েছিল। আজ তার ক্ষতবিক্ষত লাশ এই শ্রাবণের জলভরা খালে ভেসে উঠেছে...
কেক
১৬ আগস্ট, ২০২৬ এ ১:৫৮ অপরাহ্ণ