পারিবারিক চর্চার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতির কারণে শেরপুরের ১৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তির মুখে। এই সংকট মোকাবিলায় কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা, নিজস্ব ভাষার পাঠ্যবই প্রণয়ন এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সদস্যরা।
জানা গেছে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এই ১৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের মধ্যে গারো, বর্মণ, কোচ ও হদি সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
বেসরকারি সংস্থা আইইডির ‘আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিন উপজেলায় গারো ৩৪ হাজার, বর্মণ ১৭ হাজার, হদি ৪ হাজার ৫০০, কোচ ৪ হাজার, হাজং ১ হাজার ২০০, ডালু ১ হাজার ২০০, বানাই ১০০ জন, করা ১৪ জন, সাঁওতাল চারজন ও মালো তিনজন। এছাড়া বেদিয়া, চাক, চাকমা, খাসিয়া, মাহালি ও মারমা সম্প্রদায়ের সদস্য রয়েছেন একজন করে। তবে জেলা প্রশাসনের তথ্যে তিনটি উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ২০ হাজারের বেশি দেখানো হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, একসময় নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যের ব্যাপক চর্চা থাকলেও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পরিবারে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ায় মাতৃভাষার চর্চা কমে গেছে। বর্তমানে অধিকাংশ পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়, ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ থাকলেও শিক্ষকসংকটের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না। এছাড়া মাতৃভাষায় পাঠদানের ব্যবস্থা সীমিত এবং প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ের অভাব রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রতিটি বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষক নিয়োগ, মাতৃভাষার পাঠ্যবই সরবরাহ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং একটি কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
নালিতাবাড়ীর কাউলারা এলাকার কৃষ্ণ ডালু বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় ঘরে-বাইরে সবাই যার যার ভাষায় কথা বলত। এখন সেই পরিবেশটা অনেকটাই বদলে গেছে। নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষায় বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।”
একই উপজেলার পূর্ব আন্ধারোপাড়া এলাকার সঞ্জয় ম্রং বলেন, “মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ। ভাষা হারিয়ে গেলে আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অনেক কিছু হারিয়ে যাবে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
খলচান্দা এলাকার পরিমল কোচ বলেন, “অনেক ছেলে-মেয়ে এখন নিজেদের মাতৃভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারে না। পরিবার, বিদ্যালয় এবং সামাজিক সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করলে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব।”
শিক্ষকদের মতে, শিশুদের মধ্যে নিজস্ব ভাষা শেখার আগ্রহ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সীমিত। পর্যাপ্ত পাঠ্যবই ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে। ঝিনাইগাতীর শিক্ষক তৃষ্ণা ম্রং বলেন, “বিদ্যালয়ে শিশুদের শেখার আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু মাতৃভাষায় পর্যাপ্ত বই ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। নিয়মিত পাঠদান এবং পরিবারে ভাষা চর্চা একসাথে নিশ্চিত করা গেলে শিশুরা সহজেই নিজেদের মাতৃভাষা শিখতে পারবে।”
বেসরকারি সংস্থা আইইডির সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের ফেলো সুমন্ত বর্মণ বলেন, “ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর প্রধান কারণ পরিবারে ভাষা চর্চা কমে যাওয়া, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
শ্রীবরদী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মর্নিংটন ম্রং বলেন, “আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমে পরিবার থেকেই মাতৃভাষার চর্চা শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। এখানে একটি কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হলে তা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখবে।”
এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে তাদেরকে সংযুক্ত করা হচ্ছে। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”