গত শতাব্দীর শেষভাগে নেলসন ম্যান্ডেলার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণাটি জনপ্রিয়তা পায়। বর্ণবৈষম্য ও নিপীড়নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে ম্যান্ডেলা উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি ও সৌন্দর্য নিহিত থাকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, সমতা এবং সহাবস্থানই একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের মূলমন্ত্র।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। আকারে ছোট হলেও এই রূপরেখায় একটি মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কারের অনেকগুলোই এখানে স্থান পেয়েছে। তবে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার হিসেবে বিএনপি তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাবে, তা সময়ই বলে দেবে।
বিএনপির রূপরেখার দ্বিতীয় দফায় ‘রেইনবো নেশন’-এর যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, তা দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের মানুষের প্রত্যাশা। এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে জাতিগত পরিচয় বা ধর্মের ভিন্নতা নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার পথে বাধা হবে না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রই ছিল লক্ষ্য। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ যে এখনো পুরোপুরি বৈষম্যহীন হয়ে উঠতে পারেনি, তার যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের সামনে রয়েছে।
তা সত্ত্বেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারপ্রধান তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী প্রতিনিধিদের একটি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি ও উদ্বেগ জানানোর সুযোগ পেয়েছেন। নতুন সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়াকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অতীতে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য এমন সুযোগ খুব কমই এসেছে। তাই এই উদ্যোগকে সরকার ও আদিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এই সংলাপ ও সরকারি অঙ্গীকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়গুলো কতটা কার্যকরভাবে নীতি ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়, তার ওপর।
একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে রংধনুর রঙে রাঙাতে হলে উন্নয়নের মূলধারায় প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কোনো জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রতিটি জাতিসত্তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে সমৃদ্ধ করেছে, যা জাতীয় পরিচয়ের এক শক্তিশালী ভিত্তি।
এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্যে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ধাত্রীবিদ্যার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বংশপরম্পরায় অর্জিত এই প্রাচীন পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে তাঁরা যুগ যুগ ধরে নিরাপদ প্রসব সেবায় ভূমিকা রাখছেন। বর্তমান সময়ে প্রসবকালীন জটিলতায় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের প্রবণতা বাড়লেও, অতীতে আদিবাসী ধাত্রীরা আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অসংখ্য নিরাপদ প্রসব সম্পন্ন করেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎহীন পরিবেশে কুপিবাতির আলোয় তাঁদের এই সেবা ও জীবনরক্ষার নজির বিস্ময়কর।
"ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনধারা নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই তাদের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চা, প্রকৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শত শত বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা আদিবাসীদের লোকায়ত এ জ্ঞান বর্তমান সময়ের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।"
তাই আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ধাত্রীবিদ্যাসহ অন্যান্য জ্ঞান ও সক্ষমতাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এবং গবেষণার মাধ্যমে তা সমৃদ্ধ করা জরুরি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে এই ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সমন্বয় করা গেলে পাহাড়, হাওর ও চা-বাগানের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা সহজ হবে। পাশাপাশি আদিবাসীদের পরিবেশবিষয়ক লোকায়ত জ্ঞান সংরক্ষণ করলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে বলে অনেকে মনে করেন। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকবে।
— লেখক ইলিরা দেওয়ান, মানবাধিকারকর্মী। মতামত লেখকের নিজস্ব।