নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, বিরোধী দলগুলো কিসের বিরোধিতা করে এবং কোন বিষয়কে সমর্থন করে—তা মানুষ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না। তিনি বলেন, কেবল বিদেশের কোনো ঘটনা বা ইস্যু নিয়ে বিবৃতি না দিয়ে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থান—এসব বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর স্পষ্ট অবস্থান থাকা দরকার।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে ‘সমাবেশ ও গণসংগীত’ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান মান্না এসব কথা বলেন। নাগরিক ঐক্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করা হয়।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন জনগণের আস্থা ক্ষমতাসীনদের প্রতি নেই। একই সঙ্গে বিরোধী দল সম্পর্কেও মানুষ বুঝতে পারে না—তারা কিসের বিরোধিতা করে এবং কোন বিষয়কে সমর্থন করে।
জুলাই সনদ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে যারা হেঁটে যায়, সবাইকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন—তাদের ১০ জনের ৮ জন বলতে পারবে না জুলাই সনদে কী লেখা আছে। তাহলে আগে বোঝান কী দাবিতে আমি আন্দোলন করতে চাই।’
মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ এমন একটি দেশ চায় যেখানে শান্তিতে বসবাস করা যাবে, জীবনযাপন এতটা কষ্টকর হবে না এবং মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই। তবে শুধুই ধর্মের কথা বলে রাজনীতি করলে চলবে না; মানুষের অধিকার ও জীবন রক্ষার প্রশ্নেও রাজনৈতিক দলগুলোকে সোচ্চার হতে হবে।
‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরোধিতা কেন’—শীর্ষক বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাই সনদ এবং রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের কথা বলার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে দেশে আর কারও একক শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ না থাকে।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এমন একটা ব্যবস্থা চাই, যেন আর কারও ফ্যাসিবাদী হওয়ার সুযোগ না থাকে।’ এ জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভাগাভাগির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা হলে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ কমবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, গরিব মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ন্যায়বিচার পাওয়া। ভালো কোনো কাজ করতে গেলে সরকারি দল গ্রেপ্তার করে, মিথ্যা মামলা দেয় এবং সেই মামলায় বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়—এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার বলে জানান তিনি। তাই এমন একটি বিচারব্যবস্থা দরকার বলেও দাবি করেন, যেখানে আদালত স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারবে এবং কোনো মন্ত্রী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি ফোন করে আদালতের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারবেন না।
বিএনপির সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিএনপি যদি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরোধিতা করবে কেন? গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে স্বাধীনভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করার বিরোধিতা করার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
‘বড় শত্রু ঢুকে পড়বে’ শীর্ষক অংশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্রসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও দখলকেন্দ্রিক সংঘাতেরও সমালোচনা করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে দখল, ব্যানার-পোস্টার লাগানো এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের দাবিতে আন্দোলন করার বদলে ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে সংঘাতে জড়ালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
ছাত্রসংগঠনগুলোকে সতর্ক করে তিনি বলেন, নিজেদের মধ্যে মারামারি ও সংঘাতের সুযোগে বড় শত্রু ঢুকে পড়বে। সে শত্রু ঢোকার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের পরিস্থিতি যত অস্থির ও অশান্ত হবে, বহিঃশক্তির জন্য তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে। তাই ছাত্রদের জনগণের স্বার্থে কী করা প্রয়োজন, তা বুঝে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল্লাহ কায়সার বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।