বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সময়ের দাবি। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও যে বাস্তব, তা অস্বীকার করা যায় না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী ব্লেন্ডেড বা হাইব্রিড শিক্ষাদানের সুফল আদায় করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে দেশে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’–এর স্বর্ণযুগ চলছে, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধির দিকে ধাবিত হওয়ার এটি মোক্ষম সময়। শিক্ষায় উপযুক্ত পরিমাণে বরাদ্দ না দেওয়া এবং বরাদ্দকৃত অর্থ উপযুক্তভাবে ব্যয় না করার ব্যর্থতার কারণগুলো যত সুচারুভাবে চিহ্নিত ও প্রতিকার করা সম্ভব হবে, বৈশ্বিক শিক্ষামানের সমান্তরালের দিকে যাত্রাও তত সহজ হবে।

মনে রাখা যেতে পারে, পৃথিবীতে যে ১০টি দেশ জিডিপির সবচেয়ে কম অংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা বাজেটকে ব্যবহার করার অনুচিত নজিরও নিকট অতীতে দেখা গেছে।

মাঠপর্যায়ের চাহিদার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়নের একটি প্রাচীন ধারা রয়েছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারীরা পরবর্তী অর্থবছরের চাহিদা প্রেরণ করেন সাধারণত পূর্ববর্তী অর্থবছরের প্রচলিত কার্যক্রমভিত্তিকভাবে। স্থানীয়ভাবে সৃজনশীল কোনো ধারণা তুলে ধরার সুযোগ সেভাবে থাকে না। কারিকুলামের প্রয়োজনকে ভিত্তি করে বাজেট প্রণীত হয় না; বরং বাজেট তৈরির পর বাজেটের সামর্থ্য অনুসারে যতটুকু সম্ভব কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা হয়।

ফলে বাজেট বাস্তবায়ন হলেও কারিকুলাম বাস্তবায়ন অনেক সময় যথাযথ হয় না এবং শিখনফল অর্জনে ঘাটতি থেকে যায়। শিক্ষা উপকরণের জন্য বাজেটে সীমিত বরাদ্দ থাকলেও কনটেন্ট ডেভেলপমেন্টের মতো বিষয়ে বরাদ্দ থাকে না। শিক্ষায় প্রশিক্ষণকে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ আয়োজনের সুযোগ রাখা হয় না বাজেটে। কেন্দ্রীয়ভাবে যে প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা নিতান্তই অপ্রতুল। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি–৪–এর আওতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ তৈরির জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমাদের বাজেটে শুধু অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষার জন্য বরাদ্দ লক্ষ করা যায়; ন্যায়সংগত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার ধারণাটি থেকে যায় অবহেলিত।

একটি কার্যকর বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরেক বড় বাধা তথ্যের গুণগতমান। বহুধারায় বিভক্ত একটি শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রশাসন থেকে নিখুঁত পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা কঠিন। উপরন্তু মাঠপর্যায়ে তথ্য বিকৃতির প্রতিযোগিতাও থাকে। রাষ্ট্রযন্ত্রও কখনো কখনো দেশি-বিদেশি বা রাজনৈতিক লাভের আশায় সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশে ব্যর্থ হয়।

ফলে গবেষকেরা অধিকাংশ সময় সরকারি উপাত্তের বদলে বেসরকারি সংস্থা বা গবেষণার উপাত্তকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেন। এ ধরনের দুর্বল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কার্যকর বাজেট আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

শিক্ষা বাজেটের বড় একটি অংশ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়। ডিপিপি বা ‘উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা’ প্রণয়ন ও অনুমোদনের সময় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্যতা বা সম্ভাব্যতাকে পাশ কাটিয়ে, প্রকল্পের মেয়াদ–সম্পর্কিত বাস্তবতা না বুঝে রাজনৈতিক ভাবাবেগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে স্বল্প মেয়াদে কিছু সুফল এলেও দীর্ঘ মেয়াদে এসব প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না এবং বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

শিক্ষাচিন্তকেরা শিক্ষাকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী করে ব্লেন্ডেড এডুকেশন কিংবা এআই–নির্ভর শিক্ষা প্রচলনের বিষয়ে জোরেশোরে কথা বললেও বাজেটে এর প্রতিফলন নিতান্তই দায়সারা গোছের। শিক্ষা বাজেটের ৭০-৮০ শতাংশ অর্থই পরিচালন ব্যয় বা বেতন-ভাতা, পেনশন বাবদ ব্যয় হয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যা ৯০ শতাংশের বেশি। পাঠ্যপুস্তক, অবকাঠামো ও কারিগরি দ্রব্যাদির জন্য বরাদ্দ থাকে অবশিষ্ট অর্থ।

কিছু প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থও উল্লেখযোগ্যভাবে অব্যয়িত থেকে বছর শেষে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে বাজেটে ব্যবহারিক শিক্ষাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অর্থবহ ফল আশা করা যায়। শিক্ষা বাজেটকে কেবল ব্যয় হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

চলতি বাজেটের আগপর্যন্ত জাতীয় বাজেটে ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাত শিরোনামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং আইসিটি খাতকে একত্র করে যৌথ বরাদ্দ দেখানোর প্রচলন ছিল। এর ফলে শিক্ষা ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র (মোট বাজেটের কত শতাংশ, জিডিপির কত শতাংশ, শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ইত্যাদি) সম্পর্কে পৃথক ধারণা করা কঠিন ছিল।

আর ইউনেসকো ২০১৫ সালের ২১ মে দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘোষিত ইঞ্চন ঘোষণাপত্রে এসডিজি-৪–এর অধীনে মানসম্মত শিক্ষার জন্য মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করে। বাংলাদেশে বাজেটের আয়তন ক্রমে বাড়লেও এর আগে তা মোট বাজেটের ১২ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিক্রম করেনি।

শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর অভাবে শিক্ষায় মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখার ইঞ্চন ঘোষণাপত্রের লক্ষ্য থেকে আমাদের অবস্থান অনেক দূর। একদিকে সরকার অর্থাভাবে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে পারছে না, অন্যদিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দপ্তর, বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ অব্যয়িত অবস্থায় পড়ে আছে বছরের পর বছর। বিধিবিধানের আড়ালে যা একধরনের বিলাসিতার নামান্তর।

পিপিপি বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক অংশীদারত্ব সৃষ্টি করে এসব অলস অর্থ শিক্ষা বাজেটে যুক্ত করা যায় বলেই মনে করা যায়। আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার রোধে বাজেটে উদ্যোগ থাকা দরকার। আধুনিক গবেষণার অপ্রতুলতা, সুপারভাইজারের সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তি ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে দেশ থেকে প্রতিবছর ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং এর একটি অংশ আর ফিরে আসছে না। এর ফলে নতুন উদ্ভাবনী ধারণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পথে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষাচিন্তকেরা শিক্ষাকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী করে ব্লেন্ডেড এডুকেশন কিংবা এআই–নির্ভর শিক্ষা প্রচলনের বিষয়ে জোরেশোরে কথা বললেও বাজেটে এর প্রতিফলন নিতান্তই দায়সারা গোছের। শিক্ষা বাজেটের ৭০-৮০ শতাংশ অর্থই পরিচালন ব্যয় বা বেতন-ভাতা, পেনশন বাবদ ব্যয় হয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যা ৯০ শতাংশের বেশি। পাঠ্যপুস্তক, অবকাঠামো ও কারিগরি দ্রব্যাদির জন্য বরাদ্দ থাকে অবশিষ্ট অর্থ।

এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব হারায়। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকতায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করার দিকটিও বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের সময় শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ কখনোই বিবেচনা বা প্রকাশ করা হয় না।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর অভাবে যেমন মানসম্মত শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি মানসম্মত শিক্ষার অভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। এ রকম একটি প্যারাডক্স বা কূটাভাস থেকে যত দ্রুত বের হয়ে আসা যাবে, ততই মঙ্গল।

  • আশেকুল হক সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি; বোয়ালমারি সরকারি কলেজ, ফরিদপুর