স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মেয়ের পূর্ণ অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে। ২০১৭ সালে মামলা করার পর ২০২৪ সালে তিনি মেয়ের পূর্ণ অভিভাবকত্ব পান। ওই সময় হাইকোর্ট তাঁকে পূর্ণ অভিভাবকত্বের অধিকার দেওয়ার পাশাপাশি নাবালক সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বাঁধন ছাড়াও আরও তিনজন মা সন্তানের অভিভাবকত্ব পেতে তাদের সংগ্রামের কথা শোনান। কথা বলতে গিয়ে অনেকের চোখে পানি ধরে রাখা যায়নি। উপস্থিত অন্যদের মধ্যেও সেই আবেগ ছুঁয়ে যায়।

আজ শনিবার শিশুদের অভিভাবকত্ব সম্প্রসারণ প্রস্তাব (সিজিইপি) আয়োজিত সংলাপে মায়েরা এসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। শিশুদের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব–সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি বাস্তবতা এবং তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে এ সংলাপের আয়োজন করে নাগরিক কোয়ালিশন। রাজধানীর শুক্রাবাদে দৃকপাঠ ভবনে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে বাঁধন বলেন, ২০১৪ সালে স্বামীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছেদ হয়। এরপর সাবেক স্বামী আরেক বিয়ে করেন। মেয়েকে কানাডা নিয়ে চলে যাবেন এমন লেখা একটি কাগজে সই দিতে তাঁকে বলা হয়। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে আইনজীবী জানান, বাঁধন এটা করতে বাধ্য, কারণ আইনে বাবা হলেন সন্তানের অভিভাবক। তখনই মাথায় আসে প্রশ্ন—মায়ের জায়গাটা কোথায়।

বাঁধন জানান, মেয়ের বর্তমান বয়স অষ্টম শ্রেণি। খরচও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মেয়ের বাবাকে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, আগে মনে ছিল না, আবার কোর্টে যাও, আদেশ পাল্টাও। বাঁধন বলেন, শুধু আইন পরিবর্তন বা আইনি আদেশ পেলেই চলবে না; সন্তানের দায়িত্ব বাবা ও মা দুজনকেই নিতে হবে—এটি প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।

সংগীতশিল্পী ওয়ারদা আশরাফ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাকে নিয়ে আমার ছেলের ছোটবেলার কোনো স্মৃতি নেই। এর পেছনে শুধু আইনি ব্যবস্থা না, সামাজিক ব্যবস্থাও দায়ী। আমার মতো এমন মায়েদের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।’

এককাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল উল্লেখ করে ওয়ারদা বলেন, তাঁর স্বামী চাকরি করতেন না। ফলে তাঁকে চাকরি করে সন্তানদের পরিচর্যার পাশাপাশি খরচও চালাতে হয়েছে। ২০১৮ সালে বিচ্ছেদের সময় মেয়ের বয়স ছিল ৫ বছর এবং ছেলের বয়স আড়াই বছর। ওই অবস্থায় বাচ্চাদের আটকে রেখে এককাপড়ে ঘর থেকে বের হতে বাধ্য করা হয়। ২০১৯ সালে তিনি মামলা করেন।

ওয়ারদা জানান, বাবার কাছে থাকলেও ২০২২ সাল থেকে সন্তানেরা তাঁর কাছেও এসে থাকার অনুমতি পেয়েছে। তবে এর আগে ছেলেমেয়েদের মায়ের নামে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছিল। এক পর্যায়ে ছেলেমেয়েরা ভিডিও কলেও মায়ের মুখ দেখতে চাইত না। ফলে সন্তানদের সঙ্গে আবার নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে হচ্ছে।

শিক্ষিকা আতকিয়া আসিমা জানান, গর্ভে সন্তানের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই তাঁকে নানা সংগ্রাম করতে হয়েছে। সন্তানের বয়স যখন মাত্র ছয় মাস, তখন শ্বশুরবাড়ি থেকে বলা হয়—নিজের ও সন্তানের খরচ তাঁকেই বহন করতে হবে। এ কথা জানার পর তিনি স্বামীকে তালাক দেন। আতকিয়া আসিমার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের বয়স এখন ১১ বছর।

আতকিয়া আসিমা বলেন, ‘আদালতে নিয়ে বাবাকে সন্তান দেখাতে হবে এমন আদেশের পর আমি সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাবা আসতেন না। তারপর আদেশ হলো সন্তান তার বাবার কাছে দুই ঘণ্টা করে থাকবে। তখন সন্তানকে আমার নামে খারাপ কথা বলা হতো। এমনকি আমি নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম এমন কথাও বলা হয়েছিল। এতে বাচ্চা ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিল।’

সংলাপে অংশ নিতে হবে—এ কারণে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে নিজের হাতে ‘দ্য স্ট্রাগল অব এ সিঙ্গেল মাদার’ শিরোনামে একটি লেখা বা বক্তব্য লিখে দেয়। আতকিয়া আসিমা বলেন, তিনি ছেলের লেখাটি সবাইকে দেখান, এরপরই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

অধিকারকর্মী কানিজ ফাতেমা মিথিলা বলেন, ২০২৪ সালে তাঁর ৭ বছরের আইনি লড়াই শেষ হয়েছে অভিভাবকত্ব পাওয়ার মাধ্যমে। তবে অভিভাবকত্ব পাওয়ার মাধ্যমেই একজন মায়ের লড়াই শেষ হয় কি না—এ প্রশ্ন থেকে যায় বলে তিনি জানান। কোনো সমস্যা হলেই আশপাশের মানুষ বলে দেন, তুমি নিজেই সামাল দাও। মিথিলা বলেন, উন্নত বিশ্বে এমন পরিস্থিতিতে মায়েরা ভাতাসহ নানা কিছু পেলেও বাংলাদেশে এমন মায়েদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ পাওয়া যায় না।

আজকের সংলাপে সিজিইপির আহ্বায়ক আইনজীবী দিলরুবা সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে মা শিশুর হেফাজতদার হতে পারেন, কিন্তু আইনসংগত অভিভাবক হচ্ছেন বাবা। হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের পারিবারিক আইনেও অভিভাবকত্বের চিত্র মোটাদাগে একই। তিনি জানান, এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নারী ও শিশুর বিষয়ে আলাদাভাবে নজর দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদে ককাস গঠনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এতে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি মানুষের আচরণ পরিবর্তন সহজ হবে।

অভিভাবকত্ব–সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান। একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত, দত্তক, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো বিষয়ে একটি অভিন্ন পারিবারিক আইন (ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড) প্রণয়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বিদেশে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হলেও সন্তানের প্রশ্নে তাঁরা সমান সমান দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইতিবাচক বা পজিটিভ প্যারেন্টিং বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথাও বলেন।

সংসদ সদস্য আইনজীবী ফাহিমা নাসরীন বলেন, অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের দাবিটি অনেক পুরোনো দাবি। জাতীয় সংসদে এমন আইন প্রণয়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, নারীরা সন্তানের অভিভাবকত্ব কেন পেতে পারেন না—এ বিষয়ে আদালতে তথাকথিত প্রগতিশীল আইনজীবীরা নেতিবাচক বক্তব্য দেন। তাঁর মতে, মা আবার বিয়ে করলে সন্তানের অভিভাবকত্ব পাবেন না, অথচ বাবার বেলায় এ বিধান নেই। তিনি বৈষম্যমূলক বিধান পরিবর্তনের সুপারিশ করেন।

সংলাপের আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক গীতিয়ারা নাসরীন, সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন, শ্রমিক ও নারী অধিকারকর্মী তাসলিমা আখতার, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, আলোকচিত্রশিল্পী শহিদুল আলম, গবেষক তৃষিয়া নাশতারান, অধিকারকর্মী রেহনুমা আহমেদ, নাগরিক কোয়ালিশনের সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, ব্লাস্টের আইনজীবী আয়েশা আক্তার প্রমুখ।