অনুকূল আবহাওয়া এবং সময়মতো বৃষ্টির ফলে নরসিংদীর রায়পুরায় আউশ ধানের বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা করেছিলেন স্থানীয় কৃষকেরা। তবে ধান পাকার মুখে হাজার হাজার বাবুই ও চড়ুই পাখির ঝাঁকের আক্রমণে সেই আশা এখন হুমকির মুখে। পাখির অব্যাহত আক্রমণে ধানের শীষ নষ্ট হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কাঁচা ও আধাপাকা ধান কেটে ফেলছেন।
উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের পূর্বহরিপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে দেখা যায়, ঝাঁকে ঝাঁকে বাবুই ও চড়ুই পাখি নেমে ধানের শীষ খাচ্ছে। কৃষকেরা টিন-বাসন বাজিয়ে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এবং ফটকা ফাটিয়ে পাখি তাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ক্ষতি ঠেকানো যাচ্ছে না। অনেকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেত পাহারা দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, এ বছর রোগবালাই তুলনামূলক কম ছিল এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে সেচের খরচও কমেছে। ফলে তারা ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। কিন্তু ধানের শীষ বের হওয়ার পর থেকেই পাখির ঝাঁক মাঠে হানা দিয়েছে। পাখিগুলো শুধু ধানই খাচ্ছে না, বরং ঠোকর দিয়ে অসংখ্য শীষ মাটিতে ফেলে দিচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের বাড়তি শ্রমের খরচ বহন করতে হচ্ছে।
মুছাপুর গ্রামের কৃষক আবদুস রহমান বলেন, "দেড় একর জমিতে আউশের আবাদ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু ধান বের হওয়ার পর থেকেই পাখির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খেতে বসে পাখি তাড়াতে হচ্ছে। তারপরও ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে না।"
একই এলাকার কৃষানি সুহেরা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "চোখের সামনে কষ্টের ফসল নষ্ট হতে দেখে বসে থাকা যায় না। সংসারের কাজ ফেলে সারাদিন মাঠে থাকতে হয়। শুরুতে মনে হয়েছিল ভালো লাভ হবে, এখন মনে হচ্ছে খরচই উঠবে না। আগামীতে আর আউশ চাষ করব না।"
কৃষক হারুনূর রশিদ জানান, ফসল ভালো হলেও পাখির কারণে বড় ধরনের লোকসান হবে, এমনকি শ্রমিকের মজুরিও উঠবে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা নিজেরাই কাঁচা ধান কেটে ফেলছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মরম আলী ও তার স্ত্রী জানান, ধানের শীষ বের হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে পাখি তাড়াতে হচ্ছে। টিন-বাসন বাজিয়ে কিংবা ফটকা ফাটিয়েও খুব একটা সুফল মিলছে না। একই অভিযোগ করেছেন কৃষক আব্দুর রহিম, নান্নু মিয়া, শফিকুল ইসলাম ও সাইদা মিয়াসহ আরও অনেকে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রায়পুরায় ৭৩২ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে। সরকারিভাবে ১ হাজার ১৫০ জন কৃষককে উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের পাঁচ কেজি করে ধানবীজ এবং সার দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "এ মৌসুমে প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতের কারণে সেচের খরচ কম হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি অফিস থেকে আউশ ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা সহায়তা হিসেবে ১ হাজার ১৫০ জন কৃষককে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। ফলে উপজেলায় আউশ ধানের আবাদ বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এ সময় মাঠে বিকল্প খাদ্য কম থাকায় বাবুই ও চড়ুই পাখি ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে। এতে কিছুটা ক্ষতি হলেও কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।"