আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারি–৫-এ প্রদর্শিত হলো শিল্পী পলাশ ভট্টাচার্য্যের একক প্রদর্শনী ‘ভূমিবচন’ (দ্য টেল অব দ্য সয়েল)। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় ডব্লিউওডব্লিউ বাংলাদেশের অনুদানপ্রাপ্ত এই মাল্টিমিডিয়া প্রকল্পে শিল্পী চট্টগ্রামের একটি জরাজীর্ণ পৈতৃক মাটির বাড়িকে কেন্দ্র করে পারিবারিক স্মৃতি, গ্রামীণ নারীর জীবন-অভিজ্ঞতা, মৌখিক ইতিহাস এবং অবক্ষয়ী কৃষি অর্থনীতির আন্তঃসম্পর্ককে ভিডিও, ডিজিটাল কোলাজ, সিল্কস্ক্রিন ও ইনস্টলেশনের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেছেন।

সমকালীন শিল্পে স্মৃতি কেবল ব্যক্তিগত নস্টালজিয়া নয়, বরং ভাষা, বসবাস, বিশ্বাস, প্রযুক্তি, সময় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক গভীর অনুসন্ধান। পলাশ ভট্টাচার্য্যের ‘ভূমিবচন’ একটি পরিত্যক্ত পৈতৃক বাড়ির গল্পের চেয়েও বেশি কিছু; এটি সেই বাড়িকে ঘিরে জন্ম নেওয়া স্মৃতি এবং সঞ্চিত জ্ঞানের বহুস্তরীয় অনুসন্ধান। শিল্পী এখানে বাড়িটিকে সংরক্ষণ করার চেয়ে বাড়িটিকে ঘিরে জন্ম নেওয়া স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখতে চেয়েছেন।

প্রদর্শনীর আঙ্গিকে ভিডিও, সিল্কস্ক্রিন, পুরোনো আলোকচিত্র, সিআরটি মনিটর, ভিএইচএস, মরিচবাতি এবং কবুতরের অ্যানিমেশনের ব্যবহার সমকালীন স্থাপত্য শিল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও ক্রিশ্চিয়ান বোলতানস্কি, ডো হো সু কিংবা সুসান হিলারের কাজের সঙ্গে এর একটি ভাবগত সংলাপ তৈরি হয়েছে, তবে ‘ভূমিবচন’-এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট পারিবারিক অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব শিল্পভাষায় রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়ায়।

প্রদর্শনীর কেন্দ্রে থাকা বাড়িটি বর্তমানে পরিত্যক্ত হলেও শিল্পী গ্যালারিতে বাড়িটির কোনো বাস্তব বস্তু আনেননি। বস্তুর এই অনুপস্থিতিই এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-সিদ্ধান্ত। তিনি বস্তু নয়, বরং বস্তুকে ঘিরে জন্ম নেওয়া স্মৃতিকেই স্থানান্তরিত করেছেন, যার ফলে দর্শক একটি বাড়ির প্রতিরূপের বদলে তার স্মৃতির ভেতরে প্রবেশ করেন।

স্মৃতির এই বহিঃপ্রকাশে শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চলচ্চিত্রে ঠাকুমার কণ্ঠ কোনো সাক্ষাৎকার নয়, বরং এক কল্পিত উপস্থিতি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বাড়ির ভেতর কাউকে খোঁজার আহ্বান স্মৃতির নিজস্ব সময়কে বর্তমান করে তোলে। ডায়ানা টেলরের ভাষায়, সাংস্কৃতিক স্মৃতি শুধু আর্কাইভে সংরক্ষিত থাকে না; পুনরাবৃত্ত পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়েও বেঁচে থাকে। ঠাকুমার এই কণ্ঠ সেই জীবন্ত স্মৃতিরই শিল্পরূপ।

সিল্কস্ক্রিনগুলোর মাধ্যমে স্মৃতির স্তরবিন্যাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে ঠাকুমার ঝুলি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্য ছড়া ও কবিতা, পারিবারিক লোককথা এবং পুরোনো আলোকচিত্রের বিচ্ছিন্ন ভগ্নাংশ স্তরিত হয়েছে। আলেইদা আসমানের সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ঠাকুমার কণ্ঠ ও আঞ্চলিক ভাষা যোগাযোগভিত্তিক স্মৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।

প্রদর্শনীর অন্যান্য উপাদানেও এই ভাবনার সম্প্রসারণ দেখা যায়। ঘুড়ির অ্যানিমেশনের মাধ্যমে শৈশবের এক লোকবিশ্বাস—আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে দুটি তারার সংঘর্ষে আগুন লাগে—সামনে আনা হয়েছে। এটি কোনো সত্য প্রতিষ্ঠা নয়, বরং একটি সমাজ তার জগৎকে কীভাবে কল্পনা করে, তারই প্রতিফলন। একইভাবে ভিএইচএস এবং সিআরটি মনিটরের ব্যবহার অতীতের দেখার অভ্যাসের ধারক হিসেবে কাজ করেছে।

মরিচবাতির ব্যবহার এখানে বিশেষ অর্থ বহন করে। উৎসবের প্রতীক এই আলো পরিত্যক্ত বাড়ির অন্ধকারে এসে অনুপস্থিত মানুষের স্মৃতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অন্যদিকে, কবুতরের অ্যানিমেশন পরিত্যক্ত বাড়ির অদৃশ্য প্রাণ বা স্পিরিটের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যদিও ডিজিটাল ফ্যানে এই অ্যানিমেশন কখনো কখনো দর্শকের ব্যাখ্যার স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে বলে মনে হয়।

শিল্পীর সংযম এই প্রদর্শনীটিকে কেবল আবেগঘন স্মৃতিচারণা থেকে সরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের স্তরে উন্নীত করেছে। এখানে বাড়িটি আর স্থাপত্য নয়, বরং সম্পর্ক, অভ্যাস, সময় এবং যাপিত জীবনের ঘনীভূত অভিজ্ঞতা। টিম ইংগোল্ডের বসবাস-ভাবনার সঙ্গে এই কাজের একটি গভীর সংলাপ তৈরি হয়েছে।

প্রদর্শনীটির একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা যায় যে, এটি নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের চেয়ে সাংস্কৃতিক স্মৃতি-অনুসন্ধান হিসেবে বেশি সফল। নগরায়ণ, শহরমুখী অভিবাসন কিংবা অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রসঙ্গ আরও স্পষ্টভাবে যুক্ত হলে ব্যক্তিগত স্মৃতি বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হতে পারত।

তবে সামগ্রিকভাবে এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি অতীতকে সংরক্ষণের দাবি করে না। বরং দেখায়, স্মৃতি কখনো স্থির নয়; প্রতিবার ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তা নতুন অর্থ নির্মাণ করে।

‘ভূমিবচন’-এর সবচেয়ে বড় অর্জন এখানেই যে এটি অতীতকে সংরক্ষণের দাবি করে না। বরং দেখায়, স্মৃতি কখনো স্থির নয়; প্রতিবার ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তা নতুন অর্থ নির্মাণ করে। ফলে এই প্রদর্শনী একটি বাড়ির পুনর্নির্মাণ নয়; স্মৃতি ও জ্ঞানের একটি জীবন্ত আর্কাইভের পুনরাবিষ্কার। স্মৃতি ও জ্ঞান এখানে পরস্পরের পরিপূরক—একটি ছাড়া অন্যটি সম্পূর্ণ নয়। মানুষের অভিজ্ঞতা, ভাষা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি স্মৃতির মধ্য দিয়েই জ্ঞানে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়।

পরিশেষে, ‘ভূমিবচন’ কেবল একটি পরিত্যক্ত বাড়ির গল্প নয়, বরং একটি সংস্কৃতি কীভাবে তার স্মৃতি বহন করে, হারায় এবং নতুনভাবে নির্মাণ করে—তারই এক সংবেদনশীল ও বৌদ্ধিক শিল্পভাষ্য।