মেহেরপুরে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে প্রতারণার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। পরিবারের অমতে বা প্রেমের সম্পর্কের কারণে বিয়ে করতে চাওয়া তরুণ-তরুণীদের ১৫০ বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি এফিডেভিটে স্বাক্ষর করিয়ে তাদের বিশ্বাস করানো হচ্ছে যে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। তবে পরবর্তীতে দাম্পত্য কলহ বা বিচ্ছেদের সময় আদালতে গিয়ে তারা জানতে পারছেন, আইনিভাবে তাদের কোনো বিয়েই হয়নি।

মেহেরপুর জেলায় গত কয়েক মাস ধরে পরিচালিত এক বিশেষ অনুসন্ধানে এমন শতাধিক নথি ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু কোর্ট ম্যারেজ নয়, বরং নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহার করে বাল্যবিবাহ বৈধ করা, পরিচয় জালিয়াতি, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির ভুয়া স্বাক্ষর এবং বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই বিতর্কিত নথি তৈরির মতো গুরুতর অনিয়ম চালানো হচ্ছে। এমনকি বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য এফিডেভিটের মাধ্যমে তালাকও সম্পাদন করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে কোনো স্বতন্ত্র বিয়ের বিধান নেই। মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং ২০০৯ সালের বিবাহ নীতিমালা অনুযায়ী, মুসলিম বিয়ে অবশ্যই লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। নোটারি এফিডেভিট কেবল একটি হলফনামা, এটি কাবিননামার বিকল্প নয়। ফলে এর ওপর নির্ভর করে সংসার শুরু করলে নারীরা দেনমোহর, ভরণ-পোষণ ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে চরম আইনি জটিলতায় পড়েন।

অনুসন্ধানে মেহেরপুর পৌরসভার হালদারপাড়ার সাদিয়া আক্তার রুমী (পূর্বনাম পূজা) ও হীরক হকের বিয়ের ক্ষেত্রে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল রুমী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ওই দিনই ভিডিও কলের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত হীরক হকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিদেশে থাকা সত্ত্বেও এফিডেভিটে হীরকের স্বাক্ষর রয়েছে, যা আইনত অসম্ভব। এই নথিতে আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট নুরজামাল (জামান) এবং নোটারি পাবলিক হিসেবে অ্যাডভোকেট মেহেরুন নেসা (মনি) স্বাক্ষর ও সিলমোহর দিয়েছেন। পরবর্তীতে হীরক তার প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরে গেলে রুমী আদালতের দ্বারস্থ হন। বর্তমানে আমলী আদালতে সি.আর. মামলা (নং ৬৯৪/২৬) বিচারাধীন রয়েছে।

একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে এক চীনা নাগরিক ও স্থানীয় তরুণীর বিয়ের ক্ষেত্রে, যেখানে ব্যবহৃত আইনজীবীর সিল ও স্বাক্ষর ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় এনওসি নেওয়া হয়নি। এছাড়া গাংনী উপজেলার বামুন্দি এলাকায় একাদশ ও নবম শ্রেণির দুই ছাত্র-ছাত্রীর বয়স বাড়িয়ে নোটারি এফিডেভিট ও কুষ্টিয়ার ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এফিডেভিট তৈরির ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে অভিভাবকদের জিম্মায় দেয়।

গাংনী উপজেলার এক ভুক্তভোগী অভিভাবক বলেন, “আইন না জানার কারণে অন্যের কথায় বিশ্বাস করে নাবালিকা মেয়ের এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে দিয়েছিলাম। বলা হয়েছিল এটাই ‘কোর্ট ম্যারেজ’। দেড় বছর পর বিচ্ছেদ হলে জানতে পারি, বিয়ের কোনো নিবন্ধনই হয়নি। ফলে আমার মেয়ে দেনমোহর ও খোরপোষ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এখন ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে মামলা লড়ছি।”

মেহেরপুরের নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার রিজা আব্দুল মাবুদ জানান, বিয়ে সম্পাদন বা বৈধতা ঘোষণা কোনো আইনজীবী বা নোটারি পাবলিকের এখতিয়ার নয়, এটি কেবল নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমেই সম্ভব। জেলা রেজিস্ট্রার সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে কোনো নিবন্ধিত বিবাহের বিধান নেই। একইভাবে বিদেশে অবস্থানকালে ভিডিও কলে বা এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক সম্পন্ন করারও সুযোগ আইনে নেই। ফলে এগুলো আইনি ভিত্তিহীন।”

মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল আজম খোকন জানান, সশরীরে উপস্থিত না হয়ে এফিডেভিট সম্পাদনের অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিসি) তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহার রোধে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। কোনো অনিয়মের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং কেবল নিবন্ধিত কাজীর মাধ্যমেই বিয়ে সম্পাদন করতে হবে।”

উল্লেখ্য, মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। অন্যথায় সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।