কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় এক দশক পর তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতির খবর পাওয়া গেছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতের ডিএনএ বিশ্লেষণে পাঁচজনের শুক্রাণু এবং এক ব্যক্তির রক্তের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ছয়জন সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পারেন বলে ধরে তদন্ত জোরদার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম এই তথ্য জানান।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আদালতের নির্দেশে ইতোমধ্যে চার সাবেক সেনাসদস্য ও এক বেসামরিক ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে গত ১৭ জুলাই আরও দুজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দেন আদালত। তারা হলেন কুমিল্লা রাজাপাড়ার ফয়সাল আহমেদ রাব্বি এবং সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের বাসিন্দা সাবেক সেনাসদস্য জাহিদুল ইসলাম। তবে তদন্তের স্বার্থে ষষ্ঠ সন্দেহভাজনের পরিচয় এখনই প্রকাশ করা হয়নি।

ডিএনএ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে গত এপ্রিলে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তদন্তে উঠে এসেছে, মামলার প্রধান দুই সন্দেহভাজন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান জাহিদ ও সাবেক সেনাসদস্য শাহীন আলম দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ইতোমধ্যে জাহিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্ত শাহীন আলম গত এপ্রিলে গোপনে কুয়েতে পালিয়ে যান। তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন নম্বর বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে তার সর্বশেষ অবস্থান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত শনাক্ত করেছে পিবিআই।

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “শুরু থেকেই এ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এখনও কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও দাবি করেন, সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে। কারণ ঘটনার দিন তনু সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফেরার পথেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, “আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি। প্রায়ই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। মৃত্যুর আগে কেবল আমার নিষ্পাপ মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার এবং তাদের ফাঁসি দেখে যেতে চাই।”

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশে নতুন করে দুজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দেশত্যাগী দুই সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। ওই রাতেই সেনানিবাসের পাওয়ারহাউস এলাকার ঝোপ থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২০১৭ সালে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা জানানো হলেও নতুন বিশ্লেষণে তা এখন পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে।