ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ কেবল শিরোপার লড়াই নয়, বরং অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ। টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে বড় ক্লাবে যোগ দেওয়ার ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে বহুবার ঘটেছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। বিশ্বকাপে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেস ছেড়ে তিনি যোগ দিয়েছেন চিলির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব কোলো কোলোতে। তাঁর এই দলবদল আবারও প্রমাণ করল, বিশ্বকাপ এখনো একজন ফুটবলারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের হয়ে ভোজিনিয়ার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। স্পেনের বিপক্ষে দেশের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট এনে দেওয়ার পাশাপাশি দলকে নকআউট পর্বে তুলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে চিলির সবচেয়ে সফল ক্লাব কোলো কোলো তাঁকে দলে ভেড়ায়। মাঠের বাইরেও প্রভাব পড়েছে তাঁর জনপ্রিয়তায়; ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৩ কোটিতে পৌঁছেছে। এমনকি তাঁর নামে একটি নতুন সামুদ্রিক সি-স্লাগ প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে।
পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও ব্রাজিলের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলে নজর কাড়েন ফো। এরপর ক্যামেরুনের ক্যানন ইয়াউন্ডে ছেড়ে তিনি ফরাসি ক্লাব লাঁসে যোগ দেন এবং ক্লাবটির প্রথম লিগ শিরোপা জয়ের অংশ হন। পরবর্তীতে ওয়েস্ট হাম, ম্যানচেস্টার সিটি ও লিঁওর হয়ে খেলেছেন তিনি। তবে ২০০৩ সালে কনফেডারেশনস কাপের ম্যাচ চলাকালীন মাঠেই মৃত্যুবরণ করেন এই ফুটবলার।
২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ী দলের অন্যতম ভরসা ছিলেন সিলভা। অধিনায়ক এমারসনের চোটের কারণে সুযোগ পেয়ে পুরো টুর্নামেন্টের প্রতিটি মিনিট মাঠে কাটান তিনি। বিশ্বকাপ শেষে আতলেতিকো মিনেইরো থেকে প্রায় ৪৫ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে তাঁকে দলে নেয় আর্সেনাল। সেখানে ছয় বছরে দুটি এফএ কাপ জেতার পাশাপাশি ২০০৩-০৪ মৌসুমের অপরাজিত ‘ইনভিন্সিবলস’ দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে দারুণ খেলেছিলেন মাচেরানো। টুর্নামেন্ট শেষে ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্স ছেড়ে সতীর্থ কার্লোস তেভেজের সঙ্গে তিনি ওয়েস্ট হ্যামে যোগ দেন। পরবর্তীতে লিভারপুল ও বার্সেলোনায় ক্যারিয়ার গড়েন তিনি, যেখানে বার্সেলোনার হয়ে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও পাঁচটি লা লিগা শিরোপা জেতেন।
২০১০ বিশ্বকাপে চার গোল ও চার অ্যাসিস্টের মাধ্যমে জার্মানিকে তৃতীয় স্থানে নিতে বড় ভূমিকা রাখেন ওজিল। টুর্নামেন্ট শেষে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় ভের্ডার ব্রেমেন থেকে তাঁকে দলে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। সেখানে লা লিগা, কোপা দেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতার পর তিনি আর্সেনালে যোগ দেন।
অন্যদিকে, ২০১৪ বিশ্বকাপে ছয় গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ী কলম্বিয়ার এই মিডফিল্ডারের উরুগুয়ের বিপক্ষে করা দুর্দান্ত ভলিটি ফিফা পুসকাস পুরস্কার জেতে। বিশ্বকাপ শেষে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় মোনাকো থেকে তাঁকে রিয়াল মাদ্রিদে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ একাধিক শিরোপা জয় করেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে সাফল্যের পর বড় ক্লাবে যোগ দেওয়া ফুটবলারদের তালিকায় আরও রয়েছেন গিওর্গে হাজি (ব্রেসিয়া থেকে বার্সেলোনা, ১৯৯৪), দেজান স্তানকোভিচ (রেড স্টার বেলগ্রেড থেকে লাৎসিও, ১৯৯৮), কার্লোস সালসিদো (গুয়াদালাহারা থেকে পিএসভি আইন্দহোভেন, ২০০৬), নিকোলাস ওতামেন্দি (ভেলেজ সার্সফিল্ড থেকে পোর্তো, ২০১০), এদিনসন কাভানি (পালের্মো থেকে নাপোলি, ২০১০), সামি খেদিরা (স্টুটগার্ট থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ২০১০), আলেক্সিস সানচেজ (উদিনেসে থেকে বার্সেলোনা, ২০১০), কেইলর নাভাস (লেভান্তে থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ২০১৪), এনের ভ্যালেন্সিয়া (পাচুকা থেকে ওয়েস্ট হাম, ২০১৪) এবং এনজো ফার্নান্দেজ (বেনফিকা থেকে চেলসি, ২০২২)।