এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন একটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে এই নতুন বাহিনীর একটি খসড়া বিধিমালা জনমতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রক্রিয়া অনুযায়ী, খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে। নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাব-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি ভিত্তি বিলুপ্ত হবে। তবে এসআরবির নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত আগের কিছু বিধান কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকাশিত খসড়া আইনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-এর প্রতীক (লোগো), পতাকা, পোশাক, দায়িত্ব, নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
এসআরবির দায়িত্ব ও কর্মপরিধি
খসড়া আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদকদ্রব্য দমন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা হবে এসআরবির প্রধান দায়িত্ব। এছাড়া আদালত, সরকার কিংবা পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে এই বাহিনীকে।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা থাকবে এসআরবি সদস্যদের। বিশেষ করে মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী আস্তানা, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে তারা অভিযান পরিচালনা করতে পারবে।
তদন্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, আদালত, সরকার বা আইজিপির নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করবেন অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তা। পুরো প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদকক্ষ থাকবে এবং জব্দ করা মালামাল আদালতের আদেশ বা সরকারি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি
র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের কথা মাথায় রেখে নতুন বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে খসড়া আইনে একটি ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’র কথা বলা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি।
এই কমিটি নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে এবং প্রয়োজনে পৃথক অনুসন্ধান দল গঠন করতে পারবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে কমিটির। এছাড়া বাহিনীর কার্যক্রমে অবৈধ প্রভাব, হয়রানি বা অনিয়মের অভিযোগও তারা পর্যালোচনা করবে।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইউনিটের কার্যক্রমে বিধিবহির্ভূত প্রভাব, পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যথা আচরণসংক্রান্ত অসন্তোষ নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিতে পারবে কমিটি। পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা সত্তা আইনানুগ কার্যক্রমে অযাচিত প্রভাব বিস্তার করলে এবং অনুসন্ধানে তা প্রমাণিত হলে, ওই ব্যক্তি বা সত্তার দায়-দায়িত্ব নিরূপণপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করতে পারবে এই কমিটি।
শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি
সদস্যদের জন্য কঠোর শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি নির্ধারণ করা হয়েছে খসড়া আইনে। দায়িত্ব পালনকালে মাদকাসক্ত থাকা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করা, দায়িত্বে অবহেলা, বেআইনিভাবে অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্র বা সরঞ্জামের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করা কিংবা জুয়া ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মতো অপরাধের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যদি কোনো সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা ফৌজদারি অপরাধ করে পলাতক হন, তবে ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেবেন। এজন্য সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) লিখিত অনুরোধ জানানো হবে, যা ম্যাজিস্ট্রেটের পরোয়ানার সমতুল্য হিসেবে গণ্য হবে এবং ওসি পলাতক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ব্যাটালিয়নে সোপর্দ করবেন।
সংস্থান ও সাংগঠনিক কাঠামো
খসড়া অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে র্যাবের সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়-দায়িত্ব, চলমান মামলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বিদ্যমান চুক্তি এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে। নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ র্যাবের বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যবিধি কার্যকর থাকবে।
এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট, যার নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। বাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকায় থাকলেও দেশের যেকোনো স্থানে ইউনিট স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠন করা যাবে। এছাড়া ইউনিটের জন্য সরকার নির্ধারিত একটি প্রতীক (লোগো), পতাকা এবং সুনির্দিষ্ট পোশাক থাকবে।