টিফিনের টাকা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নাশতা করার বয়সে কয়েকজন শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই টাকা জমিয়ে অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াবে। ছোট্ট সেই মানবিক উদ্যোগের বয়স এখন এক দশকের কাছাকাছি। সময়ের সঙ্গে উদ্যোগটি শুধু পরিসরেই বড়ো হয়নি, বদলে দিয়েছে লক্ষ্যও। দরিদ্র মানুষের সহায়তার পাশাপাশি এবার তারা বইয়ের মাধ্যমে আলোকিত সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’। পাবনার বেড়া উপজেলার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে চালু হয়েছে এই ব্যতিক্রমী পাঠাগার।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বেড়া উপজেলার চরপেচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেড়া বালিকা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এবং বেড়া সরকারি বিপিন বিহারি উচ্চবিদ্যালয়ে পাঠাগারগুলোর উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এই উদ্যোগের শুরু হয়েছে আরও আগে। পরীক্ষামূলকভাবে বেড়া পোর্ট এলাকায় একটি ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’ স্থাপন করেছিল শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন। সেখানে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠাগার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনটি।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীর পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। অবসর সময় বইয়ের বদলে কেটে যাচ্ছে মোবাইলে। ফলে কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও মননশীল চর্চার জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনতেই তাদের এ উদ্যোগ।
পাঠাগারের নাম ‘কুঁড়েঘর’ রাখার পেছনেও রয়েছে প্রতীকী ভাবনা। সংগঠনের সদস্যরা জানান, কুঁড়েঘর সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন ও সরলতার প্রতীক। তাই এই পাঠাগারও সমাজের সব শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত। এখানে অর্থনৈতিক অবস্থান নয়, গুরুত্ব পাবে জ্ঞানচর্চা ও পাঠা অভ্যাস।
বাঁশ, কাঠ ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি ছোট্ট পাঠাগারগুলোতে রাখা হয়েছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বিজ্ঞান, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, জীবনী, সাধারণ জ্ঞান, শিশু-কিশোর সাহিত্য ও নৈতিক শিক্ষাবিষয়ক বই। টিফিনের সময় কিংবা অবসরে শিক্ষার্থীরা সেখানে বসে বই পড়তে পারবে। ভবিষ্যতে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পাঠচক্র, বই আলোচনা, বইপড়া প্রতিযোগিতা, লেখক পরিচিতি অনুষ্ঠান এবং বই উপহার কর্মসূচিরও পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তারা।
শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠনের সভাপতি মেহেরাব হোসেন জিম বলেন, টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে মানবসেবার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা বইয়ের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। আমাদের স্বপ্ন রয়েছে পর্যায়ক্রমে বেড়া উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’ গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, একটি ভালো বই একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধ বদলে দিতে পারে। তাই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরিও আমাদের কাছে সমান গুরুত্ব বহন করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনাল্ট চাকমা বলেন, বই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। একটি ভালো বই কেবল তথ্য দেয় না, একজন মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থী বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এমন সময়ে শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠনের ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’ উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক এই পাঠাগারগুলো শিক্ষার্থীদের অবসরের সময় অর্থবহভাবে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। নিয়মিত বই পড়ার মাধ্যমে তাদের কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকশিত হবে। একটি বই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, আর বইপড়ুয়া একটি প্রজন্মই পারে একটি আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে। এ ধরনের শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা সব সময় অব্যাহত থাকবে।
২০১৬ সালে কয়েকজন শিক্ষার্থীর টিফিনের টাকা সঞ্চয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন। শুরুতে সংগঠনটি দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য ও শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বর্তমানে শিক্ষা সহায়তা, ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার, ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তাসহ নানা সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। ছোট্ট এক মানবিক উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া এই সংগঠন এখন বইয়ের আলো ছড়িয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার স্বপ্ন বুনছে।