ভোলার মনপুরা উপকূল রক্ষায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ‘টেকসই’ বেড়িবাঁধ সামান্য বৃষ্টিতেই ধসে পড়ছে। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত। কাজ চলাকালীনই বাঁধের এ ভাঙনে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দ্বীপ উপজেলার অন্তত দেড় লাখ বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের কাজ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়মিত তদারকি না থাকায় নির্মিত বাঁধটি বারবার ধসে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত দেড় মাসে বাঁধটির বিভিন্ন অংশ ধসে যায়। পরে পাউবোর তাগাদায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে তড়িঘড়ি করে সেগুলো মেরামতের চেষ্টা করে। তবে গত মঙ্গলবার ও বুধবারের একটানা বৃষ্টিতেই উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশের বাঁধটি আবার ধসে পড়ে। ধসে আসা বালু ও মাটিতে ঢেকে গিয়ে স্থানীয় এক কৃষকের আমন ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘ভোলা জেলার মুজিবনগর ও মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। মোট ৫০ দশমিক ৭ কিলোমিটারের এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ পায় ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল এবং ওয়েস্টার্ন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা কাজ না করে সাব-ঠিকাদারের (সাব-কন্ট্রাক্টর) মাধ্যমে কাজ করাচ্ছে। ফলে কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধ ধসে পড়ছে। তাদের আশঙ্কা, কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে প্রবল জলোচ্ছ্বাস বা তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে পুরো বাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হবে, এতে ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশ, হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকায় নির্মিত বেড়িবাঁধের একাধিক স্থান ধসে পড়েছে। কোথাও আবার বালু সরে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশালাকার গর্ত। ধসে পড়া বালুর নিচে চাপা পড়েছে বিস্তীর্ণ আমন ক্ষেত।
হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনারচর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাপ্পী জানান, মেঘনা নদী থেকে তোলা নিম্নমানের বালু দিয়ে বাঁধটি তৈরি করায় একটু বৃষ্টিতেই ধসে পড়ছে। এতে আমার আমন খেত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল কাজী, শুভ্র ও জিসান জানান, গত বছর বেড়িবাঁধের কাজের অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারান ছাত্রদল নেতা রাশেদ। এর কিছু দিন পর মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ এলাকায় নির্মিত বেড়িবাঁধের গর্তে পড়ে প্রাণ হারায় ১০ বছরের এক শিশু। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দরপত্রের নিয়ম না মেনে নিচু মানের কাজ করায় এই গর্তগুলো তৈরি হচ্ছে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. তুহিন বলেন, ধসে যাওয়া অংশগুলো এক্সকাভেটর দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। পাউবোর প্রকৌশলীদের তদারকি ও সিডিউল মেনেই সব কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পাউবো ডিভিশন-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদ্দৌলা জানান, বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্তের সৃষ্টি ও ধস দেখা দিয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে।