কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীরচর এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশে থাকা তিতাস গ্যাসের সঞ্চালন লাইনের ছিদ্র মেরামত করা হয়েছে। প্রায় ৫০ দিন পর গতকাল বুধবার রাত ১১টার দিকে তিতাসের প্রকৌশলীরা এই ছিদ্রটি পুরোপুরি বন্ধ করতে সক্ষম হন।

স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, অন্তত দেড় মাস আগে নদের পানির নিচ থেকে গ্যাসের বুদ্‌বুদ উঠতে দেখা যায়। শুরুতে নির্গমন কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে এবং গত দুই সপ্তাহে গ্যাসের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে পানির ওপর ফোয়ারার মতো উঠতে শুরু করে।

পাইপলাইন মেরামতের কাজ চলাকালীন কিশোরগঞ্জ শহরের অনেক এলাকায় গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছিল। তবে গতকাল রাতে ছিদ্র মেরামতের পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে অধিকাংশ এলাকার চুলায় আগের তুলনায় বেশি আগুন জ্বলছে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের দাবি, অবৈধ সংযোগ নেওয়ার উদ্দেশ্যে পাইপলাইনে দেড় ইঞ্চির মতো ছিদ্র করা হয়েছিল, তবে উচ্চ চাপের কারণে সংযোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ছিদ্রটি বন্ধ করতে কয়েক দিন ধরে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তিন স্তরের পাইলিং করে পাইপের চারপাশের পানি সরানোর পর ওয়েল্ডিংয়ের মাধ্যমে ছিদ্রটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ বিভাগের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার আঞ্চলিক অপারেশন (ভালুকা) ব্যবস্থাপক মো. শামীম হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "কাজটি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে স্বস্তির বিষয়, ছিদ্রটি পুরোপুরি বন্ধ করা গেছে। এখন পাইপে উন্নত টেপ পেঁচিয়ে দেওয়া হবে।" শুরুতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, "শুরুতে ধারণা করা ছিল, কাজটি এত জটিল হবে না।" ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এই কর্মকর্তা জানান, শেষ কয়েক দিনে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার গ্যাস বের হয়ে থাকতে পারে।

তবে মেরামতের কাজে নিয়োজিত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভিন্ন হিসাব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ছিদ্রটি এক ইঞ্চিরও বেশি ছিল এবং গ্যাসের চাপ ছিল অনেক বেশি। সেই হিসাবে শেষ দুই সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার গ্যাস অপচয় হয়ে থাকতে পারে। শুরুতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার গ্যাস বের হয়েছে এবং সব মিলিয়ে অন্তত ২০ কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ গ্যাস আইন, ২০১০-এর আওতায় কটিয়াদী থানায় মামলা করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। মামলায় স্থানীয় চুন কারখানার মালিক সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দেলোয়ার হোসেন তালুকদারকে প্রধান আসামি এবং জমির মালিক সুমন মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলামকে ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি। পরিদর্শক (তদন্ত) রণজিৎ সাহা জানান, তিনি আজ থানায় যোগ দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে, তবে আসামিরা আগেই আত্মগোপনে চলে গেছেন।

সরকারের একাধিক সংস্থার পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, অবৈধ গ্যাস-সংযোগের চেষ্টাই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসন অবৈধ চুন কারখানাটি গুঁড়িয়ে দেয়। কারখানা থেকে ৭ হাজার ৮০০ ঘনফুট চুনাপাথর জব্দ করে মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের জিম্মায় রাখা হয়েছে।

মসূয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ঘটনাটি নিয়ে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছিল। ভবিষ্যতে যেন এমন অবৈধ কারখানা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।"