জুলাই মাসে দেশে মোট ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৪১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৬২৯ জন। নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮টি শিশু রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, যা মোট নিহতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এছাড়া পথচারী ও থ্রি-হুইলার যাত্রীদের প্রাণহানির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। সময়ের হিসেবে সকালে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এসব তথ্য জানিয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চালক ও আরোহীরাই সবচেয়ে বেশি। এরপর থ্রি-হুইলার যাত্রীদের মধ্যে ৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন, বাস এবং ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপের আরোহীরাও দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতীয় মহাসড়কে ১৬৯টি ও আঞ্চলিক সড়কে ১৫৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গ্রামীণ সড়কে ৬১টি, শহরের সড়কে ৬৬টি এবং অন্যান্য স্থানে ৭টি দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ১৬৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১২৩টি এবং পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১০৮টি। এছাড়া পেছন থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৪টি।

সময় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দিনের মোট দুর্ঘটনার ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ ঘটেছে সকালে। রাতে দুর্ঘটনার হার ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দুপুরে ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং বিকেলে ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সন্ধ্যা ও ভোরে দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক কম ছিল।

বিভাগীয় হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগেও দুর্ঘটনার হার ছিল উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় জুলাইয়ে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৩ জন শিক্ষার্থীসহ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী, ব্যাংক-বিমার কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিক্রয় প্রতিনিধি, শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মানসিকতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

পাশাপাশি দক্ষ চালক তৈরি, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে নীতিমালা ও অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সচেতনতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, "নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।"