বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সফলতা মূলত এর নকশার ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তাঁর মতে, এই কর্মসূচি কার্যকর করতে হলে একটি সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন (সোশ্যাল রেজিস্ট্রি), প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে আন্তর্জাতিক গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 'সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে কতটা কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে' শীর্ষক এই বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

বৈঠকে ফাহমিদা খাতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়–দপ্তরের অধীনে অসংখ্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালিত হলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একই ধরনের একাধিক কর্মসূচি পরিচালিত হওয়ায় সম্পদের অপচয় হচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত ফলাফলও মিলছে না। তাই এখন সময় এসেছে, বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার। একই সঙ্গে কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা ও ফলাফল মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।"

সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহায়তার পরিমাণ বাস্তবসম্মত করার কথা বলেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি উল্লেখ করেন, "সুবিধাভোগী নির্বাচন, অন্তর্ভুক্তি ও বাদ পড়ার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সহায়তার পরিমাণ এমন হতে হবে, যাতে তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে। অতীতে ৫০০ বা ৬০০ টাকার ভাতা দিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সে তুলনায় মাসে আড়াই হাজার টাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক, বিশেষ করে যাঁদের হাতে নগদ অর্থের প্রবেশাধিকার নেই, তাঁদের জন্য। তবে এই অর্থ স্থির থাকবে, নাকি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়ানো হবে—এ বিষয়ে শুরু থেকেই সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।"

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, "অতীতে স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম, দুর্নীতিসহ সুবিধা বণ্টনে ফাঁকফোকরের বহু অভিযোগ ছিল। তাই প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সেবা প্রদানের দক্ষতা বাড়াতে হবে।"

কর্মসূচির প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণের কথা বললেও সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে বলে মত দেন তিনি। পরিশেষে ফাহমিদা খাতুন বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়া উচিত।