২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে বিদায় নেওয়ার পর এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করছে ব্রাজিল। ১৯৯০ সালের পর এবারই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই (শেষ ষোলো থেকে) বিদায় নিতে হয়েছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত তালিকায় ১১তম স্থানে থাকা ব্রাজিলের এই পারফরম্যান্স ফুটবলের ইতিহাসে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন বা সবচেয়ে বাজে হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই বিপর্যয়ের পর সেলেসাওদের লক্ষ্য এখন ২০৩০ সালের সেন্টেনারি বা শতবর্ষী বিশ্বকাপ। নিজেদের জার্সিতে ‘ষষ্ঠ তারকা’ যোগ করার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। এই নতুন যাত্রার সূচনা হবে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুটি প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে—২৫ সেপ্টেম্বর টাউন্সভিলে এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ব্রিসবেনে। এরপর ৩ অক্টোবর কলকাতার সল্টলেকে ভারতের মুখোমুখি হবে তারা।
কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দল পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়ায় ফিফা ২৫ বছর বা তার কম বয়সী ১০ জন উদীয়মান ফুটবলারকে চিহ্নিত করেছে। চোট বা অন্যান্য কারণে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে সুযোগ না পেলেও, জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া এই তরুণরা ভবিষ্যতে প্রতিটি পজিশনে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এই তালিকায় রয়েছেন ১৯ বছর বয়সী রাইট-উইঙ্গার এস্তেভাও। অসাধারণ টেকনিক্যাল স্কিল এবং মাঝমাঠে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই তরুণ হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি। চেলসিতে উইঙ্গার কিংবা প্লে-মেকার হিসেবে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এস্তেভাও ব্রাজিলের হয়ে ১১ ম্যাচে ৫টি গোল করে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন।
রক্ষণভাগের নতুন কান্ডারি হতে প্রস্তুত ২০ বছর বয়সী সেন্টারব্যাক রেইস। গত মৌসুমে লা লিগা থেকে অবনমিত হওয়া জিরোনায় ধারে খেলে নজর কেড়েছেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটিতে ফিরে এখন প্রথম একাদশে স্থায়ী হওয়ার আশা করছেন রেইস। গত মার্চে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে তিনি জাতীয় দলে ডাক পান এবং আনচেলত্তির বিশ্বকাপের ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক দলেও ছিলেন।
লেফটব্যাক পজিশনে নজর কাড়ছেন ২৩ বছর বয়সী কাইকি। ব্রাজিলিয়ান সিরি ‘আ’তে ক্রুজেইরোর হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে গত মার্চে জাতীয় দলে ডাক পান তিনি এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে শেষ ১৪ মিনিট খেলেন। বর্তমানে সেস্ক ফাব্রেগাসের সিরি ‘আ’ ক্লাব কোমোতে ধারে যোগ দেওয়া কাইকি রক্ষণে বেশ শক্তপোক্ত। ইতালিতে নিজের আক্রমণাত্মক ধার বাড়াতে পারলে তিনি রবার্তো কার্লোস বা মার্সেলোর যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেন।
রাইটব্যাক পজিশনে প্রথম পছন্দের দাবিদার ২২ বছর বয়সী ওয়েসলি। আনচেলত্তির পছন্দের নিয়মিত মুখ হলেও বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগের প্রস্তুতি ম্যাচে চোটে পড়ে তিনি ছিটকে যান। বর্তমানে ইতালিয়ান ক্লাব রোমার হয়ে মিডফিল্ডের বাঁ পাশে খেললেও তাঁর মূল পজিশন রাইটব্যাক। ২০২৫ সাল থেকে ব্রাজিলের হয়ে ৮টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
মাঝমাঠের শক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন ২২ বছর বয়সী বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার সান্তোস। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নতুন এই রিক্রুট বিশ্বকাপের আগে চেলসিতে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়ায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তবে ডিফেন্ডারের মতো শারীরিক শক্তি ও নাম্বার টেনের মতো খেলা তৈরির অদ্ভুত ক্ষমতার মিশ্রণ রয়েছে তাঁর। অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে শুরু করে ব্রাজিলের প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলে খেলা সান্তোস মূল জাতীয় দলের হয়ে ৬টি ম্যাচ খেলেছেন।
আক্রমণের অন্যতম ভরসা ২৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড, যিনি আনচেলত্তির চূড়ান্ত বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়া সবচেয়ে বড় নামগুলোর একজন। চেলসির হয়ে প্রথম মৌসুমেই সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২০টি গোল করেন তিনি (যার মধ্যে ১৫টি প্রিমিয়ার লিগে এবং ৩টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে)। ব্রাজিলের হয়ে ৮ ম্যাচে এখনো গোলের খাতা না খুললেও সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তিনি দারুণ দক্ষ।
মিডফিল্ড পুনর্গঠনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেন ২৫ বছর বয়সী গোমেস। উলভস প্রিমিয়ার লিগে অবনমিত হলেও নিজের মান ধরে রেখে অ্যাস্টন ভিলায় যোগ দিয়েছেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে তিনটি মৌসুমের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন গোমেসের রক্ষণকাজের পাশাপাশি আক্রমণে ওঠার ভালো সামর্থ্য রয়েছে। ২০২৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া এবং ১০টি ম্যাচ খেলা গোমেস এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
২৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড কাইও জর্জও কোচের নজরে আছেন। ২০২৫ সালে ব্রাজিলের শীর্ষ লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ক্রুজেইরোর হয়ে খেলা কাইও জর্জ চিলির বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বদলি হিসেবে একমাত্র ম্যাচ খেলেছেন। আনচেলত্তির ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক তালিকায় তাঁর নাম ছিল। তিনি মূল স্ট্রাইকার কিংবা ‘ফলস নাইন’—উভয় পজিশনেই মানিয়ে নিতে পারেন এবং হাই-প্রেসিং ফুটবলে দক্ষ।
ফরোয়ার্ড লাইনে রয়েছেন ভিতর রকি, যার বয়স ২০৩০ বিশ্বকাপে হবে মাত্র ২৫ বছর। অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্স থেকে বার্সেলোনায় গিয়ে সুযোগ না পেয়ে রিয়াল বেতিস ঘুরে বর্তমানে তিনি ফিরেছেন ব্রাজিলের পালমেইরাসে। চোটের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপে না থাকলেও আনচেলত্তির ভাবনায় তিনি আছেন। ২০২৩ সালে মরক্কো এবং গত নভেম্বরে তিউনিসিয়ার বিরুদ্ধে জাতীয় দলের হয়ে দুটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
সবশেষে রয়েছেন ২৫ বছর বয়সী স্ট্রাইকার, যিনি ২০২৪ সালের শেষের দিকে বোতাফোগোতে থাকাকালীন বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ব্রাজিলের হয়ে চারটি ম্যাচে প্রথম একাদশে ছিলেন। নটিংহাম ফরেস্টে যোগ দেওয়ার পর আনচেলত্তির অধীনে মাত্র ১০ মিনিট খেলার সুযোগ পেলেও শারীরিক শক্তি ও টেকনিক্যালি নিখুঁত এই ফুটবলার ফরেস্টের হয়ে প্রথম মৌসুমে ১৬টি গোল করেছেন, যার মধ্যে ৭টিই এসেছে উয়েফা ইউরোপা লিগে।