বাংলাদেশের চাকরিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে টাঙ্গাইলে গড়ে উঠেছে একটি ব্যতিক্রমী কলেজ। একসময় যাকে নিয়ে সমাজে উপহাস করা হয়েছিল, সেই উপহাসকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন মো. সানোয়ার হোসেন। দীর্ঘ সংগ্রাম ও দৃঢ় প্রত্যয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে পাঠদানের পাশাপাশি কৃষি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, শুধুমাত্র চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশে প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে ‘মহিষমারা কলেজ’। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি একটি সমন্বিত কৃষি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কলেজ ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আনারস, কচু, আদা, ড্রাগন ফল, কফি ও বনজ গাছের সমাহার। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে মৎস্য খামার ও মাঠপর্যায়ের নানা প্রশিক্ষণ সুবিধা।

এছাড়া ক্যাম্পাসে একটি ‘কৃষি উন্মুক্ত লাইব্রেরি’ রয়েছে, যেখানে কৃষি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক বই সংরক্ষিত আছে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠের পাশাপাশি পাঠদানের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি গবেষণা, চারা উৎপাদন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, "দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে চাকরির দিকে ঠেলে দেয়। একজন শিক্ষিত মানুষ অন্যের অধীনে কাজ করতে চায়, স্বাধীনভাবে কিছু করার চিন্তাভাবনা কম থাকে। মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও আত্মনির্ভরশীল মানসিকতা বিকাশের লক্ষ্যেই আমি এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি।"

তিনি অতীতের উপহাসের স্মৃতিচারণ করে বলেন, "কৃষিতে যে এত বড় সম্ভাবনা আর লাভ রয়েছে, তা ভুলে মানুষ অন্যের অধীনে চাকরির পেছনে দৌড়ায়। তরুণের বাহুবল যদি সঠিক কাজে লাগে, তবে এই দেশে সোনা ফলবে। যারা আমাকে নিয়ে ট্রোল করেছিল বা হেসেছিল, তাদের দেখিয়ে দিলাম—কৃষিকাজ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সফল মানুষও করে।"

এখানে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, ফসল উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে পড়ালেখার পাশাপাশি তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে।

স্থানীয় যুবক আব্দুল কাদের বলেন, "কলেজটি এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।"

রুবেল নামে কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, "কৃষিভিত্তিক এই উদ্যোগ আমাদের নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে। পড়ালেখা শেষ করে আমরা নিজেরা উদ্যোক্তা হব এবং কৃষিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব।"