৭৮ বছর বয়স, দুই হাঁটুর একটিতে অস্ত্রোপচার শেষ, অন্যটিতেও হবে। হাঁটাচলায় কিছুটা খুঁড়িয়ে চললেও চোখে সেই চেনা দীপ্তি। স্বপ্নটা এখনো বদলায়নি—বাংলাদেশ হকিকে এশিয়ার সেরাদের কাতারে ফিরিয়ে নেওয়া। ২০০৮ সালে প্রথমবার বাংলাদেশে আসা এই জার্মান কোচ ২০১৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় দল ও বিভিন্ন ক্লাবের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর গত শুক্রবার আবারও জাতীয় দলের কোচ হিসেবে ফিরেছেন তিনি। সম্প্রতি তাঁর হোটেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হৃদয়ের কথা খুলে বলেছেন পিটার গেরহার্ড।
প্রায় ১০ বছর পর বাংলাদেশে ফেরার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “সত্যি বলতে আমার কাছে বাংলাদেশ কখনোই শুধু কর্মস্থল ছিল না। ২০০৮ সাল থেকে এই দেশে আসছি। এখানকার মানুষ আমাকে যেভাবে গ্রহণ করেছে, সেটা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারব না। অনেক দেশেই কাজ করেছি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আমাকে যে আন্তরিকতা দিয়েছে, সেটা খুবই বিরল। তাই এত বছর পর আবার ফিরে আসতে পেরে মনে হচ্ছে, অনেক দিন পর নিজের মানুষদের কাছেই ফিরলাম।”
২০১৬ সালে তাঁর বিদায়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে গেরহার্ড বলেন, “হ্যাঁ, সেই গল্পটা সুখের ছিল না। ২০১৬ সালে আমরা তখন ভালোমতোই এগোচ্ছিলাম। কিন্তু মাঠের বাইরের কিছু বিষয় সবকিছু বদলে দিল। সাফল্যের পরও আমার চুক্তি নবায়ন হয়নি। কিছু মানুষের সঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে চলে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ ছিল না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছিল এই ভেবে, কাজটা শেষ করতে পারলাম না। পরে বহুবার জানতে চেয়েছি, আমি কি ফিরতে পারি? প্রতিবারই শুনেছি, তাদের নাকি আরও ভালো কোচ আছে। আজ ১০ বছর পর আবার আমাকে ডাকা হয়েছে। সময়ই হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে।”
এত অভিমান ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর কেন ফিরলেন, সেই প্রশ্নে তিনি জানান, “কারণ, অভিমান কখনো ভালোবাসাকে হারাতে পারে না। আমি এই দেশের খেলোয়াড়দের ভালোবাসি। কোচ না থাকলেও তাদের খোঁজ নিয়েছি, ভিডিও পাঠিয়েছি, কীভাবে উন্নতি করবে, সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আমি জানতাম, সুযোগ পেলে এই দল আরও অনেক দূর যেতে পারে। তাই বাংলাদেশ ডাকলে আমার পক্ষে ‘না’ বলা সম্ভব হয় না।”
৭৮ বছর বয়সে এই বড় দায়িত্ব নেওয়া প্রসঙ্গে হেসে তিনি বলেন, “বয়স তো শুধু পাসপোর্টে লেখা একটা সংখ্যা। আমি নিজেকে এখনো অনেক তরুণ মনে করি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাই। ডাক্তাররাও বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা অনেক কম বয়সীর মতো। মাঠে কাজ করার ইচ্ছা, শক্তি আর উদ্দীপনা এখনো আগের মতোই আছে। যত দিন সেই আগুন থাকবে, তত দিন আমি কোচিং করাব।”
জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার ইচ্ছা নিয়ে তিনি বলেন, “আমি কারও কাছে কিছু প্রমাণ করতে চাই না। আমি শুধু চাই, কাজটা শেষ করতে। যদি পারি, খুব ভালো। যদি না পারি, আমি নিজেই ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাব। আমার কাছে দায়িত্ব মানে দায়িত্বই। অজুহাত দিয়ে আমি কখনো বাঁচতে চাইনি।”
এশিয়ান গেমসের আগে হাতে থাকা মাস দেড়েক সময় নিয়ে তিনি জানান, “সময় কম, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রথমে খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর ফিটনেস, শৃঙ্খলা আর দলগত বোঝাপড়ায় কাজ করতে হবে। আমি চাই, মাঠে এমন একটি দল নামুক, যারা শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করবে। ফল যা–ই হোক, প্রতিপক্ষ যেন বুঝতে পারে বাংলাদেশ সহজ প্রতিপক্ষ নয়।”
শীর্ষ ছয়ে না থাকলে বিদায় নেওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “হ্যাঁ, কারণ আমি নিজের কাছে দায়বদ্ধ। যদি লক্ষ্য পূরণ করতে না পারি, তাহলে আমার থাকার কোনো মানে নেই। আমি অজুহাত দিতে চাই না। আবার যদি আমরা লক্ষ্য পূরণ করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আমি সব সময় ফলাফল দিয়েই নিজের মূল্যায়ন করতে পছন্দ করি।”
বাংলাদেশকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “এটাই আমার সেকেন্ড হোম। এখানে নামলেই মনে হয়, আমি নিজের আরেকটি বাড়িতে ফিরে এসেছি। জীবনে অনেক দেশ দেখেছি, অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু বাংলাদেশ আমার কাছে অন্য রকম একটা জায়গা নিয়ে আছে।”
সাক্ষাৎকারে জিমিকে ‘বাংলাদেশের মেসি’ বলে অভিহিত করেছেন কোচ পিটার গেরহার্ড।