ইরানের সঙ্গে সংঘাতের টানাপোড়েনে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থায় পড়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধ থামানোর জন্য স্পষ্ট কোনো পথ তাদের সামনে দেখা যাচ্ছে না। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইরানে থেমে থেমে বোমা হামলা চালিয়েও তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশাল সামরিক অভিযানের বারবার হুমকিও ইরানকে মার্কিন দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে পারছে না।

এর পাশাপাশি আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে আসছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তায়ও ধস নেমেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে যে পণ্য সংকট তৈরি হয়েছে, তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনছে। এসব কারণে যুদ্ধ থামাতে মার্কিন সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও দিন দিন বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে—যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে আসলে কী বিকল্প আছে?

আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান দ্রুত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জলযান চলাচল বন্ধের হুমকি দেয়; অর্থাৎ তারা প্রণালিটি অবরুদ্ধ করে ফেলার ইঙ্গিত দেয়। ইরান আগে থেকেই এমন হুমকি দিয়ে আসছিল। তবু মার্কিন প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে অপ্রস্তুত ছিল এবং তাদের উপযুক্ত কোনো জবাব তৈরি ছিল না।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তেলজাত পণ্য পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পথ। টানা পাঁচ মাস বন্ধ থাকার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। হরমুজ প্রণালি না খুললে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ কেন আসন্ন—এ প্রসঙ্গও তখনই সামনে আসে।

মার্কিন প্রশাসনের অগ্রাধিকার এখন ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ছাড়তে বাধ্য করা নয়। তাদের মূল লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালি দ্রুত উন্মুক্ত করা। তবে কাজটি করতে গিয়ে আমেরিকা এক বড় সমস্যার মুখে পড়েছে। একদিকে ইরান মনে করছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ঠেকাতে হরমুজ প্রণালির পূর্ণ কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকা অপরিহার্য। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই জলপথ খুলে দেওয়া এবং তা নিরাপদ রাখার ক্ষমতা রাখে না।

ট্রাম্প বারবার ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানিদের এমন চাপে ফেলা, যাতে তারা মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। সম্প্রতি তিনি ইরানের বেসামরিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর হুমকিও দিয়েছেন। তবে এর পরদিনই ট্রাম্প তাঁর অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে ভারী আঘাত চালিয়ে ইরানকে দমানো যাবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) নতুন কট্টরপন্থী নেতৃত্ব মনে করে আমেরিকা ও ইসরায়েল তাদের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে একেবারে মুছে ফেলতে চায়। তাদের মতে, মার্কিন চাপের মুখে কোনো ছাড় দিলে তা কেবল আরও বেশি চাপের পথ তৈরি করবে। তাই আমেরিকার এ ধরনের সামরিক তৎপরতা ইরানকে আত্মসমর্পণ করাবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ বিকল্প নিয়ে আলোচনার সময় সবচেয়ে বড় সত্যটি মনে রাখা দরকার। এই মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না। তারা কখনোই তা করেনি। তারা বিশ্বাস করে শুল্ক আরোপ, নিষেধাজ্ঞা বা বোমা হামলার মতো শক্ত প্রয়োগের ভাষায়। আমেরিকার গুরুত্ব দিয়ে কূটনীতিতে বসতে না চাওয়ার মানসিকতার কারণে এক সংকট তৈরি হয়েছে। তারা যদি হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়ও, তাহলেও একটি দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হবে।

সবশেষ পারমাণবিক আলোচনাটি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর ধরে চলেছিল। এর মধ্যে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এই ব্যর্থ যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এখন তাদের অন্য বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই তারা এ ধরনের কোনো দীর্ঘ আলোচনায় সময় দিতে রাজি নয়।

যেহেতু আমেরিকা হরমুজ প্রণালির সমাধান করতে কূটনীতি ব্যবহারে অনিচ্ছুক ও অক্ষম, তাই তাদের উচিত জুন মাসে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর অনুচ্ছেদ ৫-এর প্রক্রিয়াটি মেনে নেওয়া। ইরান ও ওমানের মধ্যে এই আলোচনা এখনো চলছে। সমস্যাটির সবচেয়ে কম ক্ষতিকর সমাধানের এটাই সেরা সুযোগ। এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রশাসনের কাজ হবে কেবল ওমানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তিকে অনুমোদন করা।

এ ধরনের চুক্তির একটি অংশ হবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া। কারণ, ইরান এই অবরোধ তোলার শর্তের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি যুক্ত করেছে।

ইরান ও ওমানের এই আলোচনার শেষ পরিণতি কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটি পরিষ্কার যে ওমান এবং গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) অন্য সদস্যরা আমেরিকার চেয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও আগ্রহী। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে চায়। অন্যদিকে ইরান চায় একটি ‘নতুন নিয়ম’, যেখানে তারা ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে বা এককভাবে এই জলপথের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে। দুর্ভাগ্যবশত, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত সুবিধার কারণে অন্তত স্বল্পমেয়াদে তাদের দাবিই টিকবে বলে মনে হচ্ছে। যার ফলে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরান নির্দিষ্ট ‘ফি’ বা মাশুল আরোপ করতে পারে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যদি কোনো চুক্তি হয়ও, তা হবে অত্যন্ত নড়বড়ে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে পরিমাণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলত, সেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে অনেক সময় লাগবে—সম্ভবত কখনোই আগের মতো হবে না।

এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে যাবে এবং ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। অন্যদিকে ইরান তাদের ওপর ভবিষ্যৎ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এটিই সম্ভবত বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে সেরা সম্ভাব্য পরিণতি। একটি অদূরদর্শী যুদ্ধের পরিণতি এটাই হয়—যা শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনার বদলে কেবল অর্থনৈতিক সংকট, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং আমেরিকার প্রভাব ও ক্ষমতার অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে।

অ্যালান এয়ার মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একজন ডিপ্লোমেটিক ফেলো

আল–জাজিরা থেকে থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত