বাইকে চড়লেই যে স্বাধীনচেতা কেমন করে পরীক্ষায় ফেলে, সেটা টের পেলাম সেদিন। না, বাইকওয়ালা ঠিকই ছিল। সমস্যাটা ছিল ওই হেলমেট। হেলমেটটা মাথায় থাকতেও যেন আপন মনে চলত—ক্যাম্পাসের আহ্লাদ দেখিয়ে যেন মাথায় তোলা কোনো জুনিয়রের মতো আচরণ করছিল। মাথায় তুলতেই সেটা নিজের মত করে নাচ শুরু করে দিল।
ফ্লাইওভারে উঠতেই মনে হলো, রিয়াজের মতো ইলেকট্রিক গিটার নিয়ে লাফাচ্ছে আর গান গাচ্ছে—‘ঝাকা নাকা ঝাকা নাকা ঝাকা নাকা দেহ দোলা না’। কথা ছিল, ও আমার মাথাটা বাঁচাবে। কিন্তু ওকেই বাঁচাতে গিয়ে আমি কূল খুঁজে পেলাম না।
মনে মনে ভাবলাম, হয়তো ছ্যাঁকা খেয়ে ঠিক আমার বন্ধুর মতোই চলে যেতে চাইছে—যেমন রাফি। রাফি সেদিন হাতিরঝিেল গিয়ে আমাকে ফোন করে বলেছিল, ও নাকি ওই মেয়েকে ছাড়া বাঁচবে না। আমি বললাম, বাসায় আয়। একসাথে রিলস দেখব। আরে—মরা তো দূর, ফাজিলটা পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাসায় এসে হাজির। তারপর আমার স্কুটার আর দামি হেলমেটটা নিয়ে চলে গেল।
এ সব দুঃখের কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলাম বাংলামোটরে। জ্যামে বসে এক হাতে ফোনে গুগল ম্যাপ ওপেন করে দেখছি, আর অন্য হাতে হেলমেটটা কেবল হাত থেকে ছেড়ে দিতেই—বাইকওয়ালা ফুটপাত দিয়ে টান। দোয়া–কালাম পড়ে কোনোমতে হেলমেটটা এ যাত্রার মতো বাঁচিয়ে ফেললাম।
.টেসলা বনাম সরকার.এরপরও স্বস্তি হলো না। শাহবাগের মোড়ে পৌঁছে মোড় ঘুরতেই হেলমেটটা ‘বিদায় পৃথিবী’ বলে স্লো মোশনে আমার মাথা থেকে ছিটকে সোজা ট্রাকের নিচে চলে গেল। অনন্ত জলিল এই সিন দেখলে একটা সিনেমা বানাতেন, নাম দিতেন ‘লাফ—দ্য জাম্প’।
বাইক থামিয়ে লোকটা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন তার কিডনি বেচে দিয়েছে আমি। চোখ দুটো ছলছল করছে। আমি বললাম, ‘ভাই, যে যাবার সে তো যাবেই।’ দেখি লোকটা এবার সত্যিই কেঁদে ফেলেছে। বলল, ‘আমার বউ আমাকে আস্ত রাখবে না। আপনার জন্য আমার সংসারটা ভেঙে যাবে এবার।’
আমি বললাম, নাহ! এটা হতে দেওয়া যায় না। আমি কারও সংসার ভাঙার অপবাদ নিতে পারব না।
‘আপনি কিছু মনে না করলে আমি একটা নতুন কিনে দেব?’
‘অবশ্যই দেবেন। ক্ষতি করলে ক্ষতিপূরণ তো দিতেই হয়, তাই না?’
কিছু বুঝে উঠলাম—দিনটা সত্যিই খারাপ। বেশি বাড়াবাড়ি না করে যেভাবে বের হয়েছিলাম সেভাবেই ফিরে এলাম। তাই আর কিছু না বলে কিছু টাকা দিয়ে তাকে বিদায় করলাম।
.রসচিঠি.এখন যদি আপনার মনে হয়, আমার সাথে আর কিছু খারাপ হবে না, তাহলে আপনি অত্যন্ত ভুল ভাবছেন।
আরেকটা বাইকে চড়ে বসলাম। আবার বাইকওয়ালা আমার হাতে হেলমেট দিল। আমার মাথার চেয়ে তো বড়, তার ওপর এবারেরটার বেল্টটাও ছেঁড়া।
‘ভাই, হেলমেট এমন কেন?’
‘কিছু হবে না আপু, একটু ধরে রাখলেই হয়।’
‘একটু আগেই একটা হেলমেট পড়ে গেছে, ভাই।’
‘কী বলেন! আপু, সাবধানে, হেলমেটটা ঠিক রাইখেন!’
‘না, ঠিকই তো, আমার মাথা যায় যাক, হেলমেটটা ঠিক থাকুক।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। বাইক টান দিতেই মনে হলো হেলমেটটা মিটিমিটি হাসছে। পড়ে যাওয়া হেলমেটটার দিকেও যেন তাকিয়ে গান গাইছে—‘মোস্তফা মোস্তফা, ডোন্ট ওয়ারি মোস্তফা; আমি তো বন্ধু মোস্তফা…’
বিশ্বাস করেন, পকেটে আর বাড়তি টাকা নেই আরেকটা হেলমেটের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার। আজ হেলমেটের একদিন কি আমার একদিন!
.এখন যদি আপনার মনে হয়, আমার সাথে আর কিছু খারাপ হবে না, তাহলে আপনি অত্যন্ত ভুল ভাবছেন।
আরেকটা বাইকে চড়ে বসলাম। আবার বাইকওয়ালা আমার হাতে হেলমেট দিল। আমার মাথার চেয়ে তো বড় অবশ্যই, তার ওপর এবারেরটার বেল্টটাও ছেঁড়া।
‘ভাই, হেলমেট এমন কেন?’
‘কিছু হবে না আপু, একটু ধরে রাখলেই হয়।’
‘একটু আগেই একটা হেলমেট পড়ে গেছে, ভাই।’
‘কী বলেন! আপু, সাবধানে, হেলমেটটা ঠিক রাইখেন!’
‘না, ঠিকই তো, আমার মাথা যায় যাক, হেলমেটটা ঠিক থাকুক।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। বাইক টান দিতেই মনে হলো হেলমেটটা মিটিমিটি হাসছে আর পড়ে যাওয়া হেলমেটটার দিকে তাকিয়ে গান গাচ্ছে—‘মোস্তফা মোস্তফা, ডোন্ট ওয়ারি মোস্তফা; আমি তোর বন্ধু মোস্তফা…’
বিশ্বাস করেন, পকেটে আর বাড়তি টাকা নাই আরেকটা হেলমেটের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার। আজ হেলমেটের একদিন কি আমার একদিন!
.মাথার ওপর হেলমেটটা মনে হলো আবার খিখিখিখি করে হাসছে। এবার গান ধরেছে, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, মোরা ঝর্ণার মতো চঞ্চল...’
আমিও শক্ত করে হেলমেটটাকে চেপে ধরে গান গাইতে শুরু করলাম, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি…’