‘এই বিল আপনার?’

মজিদ মিয়া পিচিক করে থুতু ফেলে তাকালেন। মিসির আলি লক্ষ্য করলেন, মজিদ মিয়ার চোখে পলক পড়ছে না। বাংলা সাহিত্যে ‘অপলক’ বলে একটা শব্দ আছে। এটা কথার কথা হলেও বাস্তবে তা যে কারও চোখে থমকে যেতে পারে—সেটাই যেন রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন এমন হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবনায় ডুবে রইলেন মিসির আলি।

ভাবনা-১: মজিদ মিয়া জন্ম থেকেই চোখের পলক ফেলেন না। বাংলা সাহিত্যে ‘কাকচক্ষু’ বলে একটা শব্দ আছে। মজিদ মিয়ার ক্ষেত্রে সেটা কেমন যেন উল্টো পথে চলে গেছে—মাছচক্ষুর ইঙ্গিত। অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত প্রাণ ও প্রকৃতিবিজ্ঞানী পল ওয়াটশন তাঁর গবেষণাপত্রে দাবি করেছেন, প্রকৃতি মাঝেমধ্যেই প্রাণের মধ্যে নিজস্ব নিরীক্ষা চালায়। এই নিরীক্ষা প্রকৃতি করে প্রাণকে টিকিয়ে রাখার জন্য। তাহলে মজিদ মিয়াকে প্রকৃতি ঠিক কীভাবে টিকিয়ে রাখতে চায়—এ প্রশ্নই ঘুরতে থাকে মিসির আলির মনে।

ভাবনা-২: মজিদ মিয়ার চোখে পলক পড়ে না, কারণ মজিদ মিয়া মানুষ নন—এমনও ভাবেন তিনি। মানুষ হলে তো পলক পড়ত। তাহলে মজিদ মিয়া আসলে কী?

‘মজিদ মিয়া, এ বিল কিসের জানতে পারি?’

‘পারেন স্যার।’

মিসির আলি অপেক্ষা করছিলেন, মজিদ মিয়া বাকি উত্তরটা দেবেন। কিন্তু তিনি আক্ষরিক অর্থেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মিসির আলির শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ১৩ দিন ধরে একটানা শুকনো কাশিতে তিনি বিধ্বস্ত। পরিবারের ছেলেটা গ্রিন ফার্মেসি থেকে একটা কফ সিরাপ এনে দিয়েছে। সেটা খাওয়ার পর রাত-দিন ঘুম আসে—এখনও চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তাই মজিদ মিয়া গেলে বিছানায় এলিয়ে পড়বেন—এমন ইচ্ছাকে সঙ্গী করে তিনি কাতর স্বরে তাগিদ দিলেন, তাহলে বলেন—এটা কিসের বিল?

‘কারেন্টের বিল স্যার।’

‘আচ্ছা আচ্ছা।’

‘আপনে হয়তো খিয়াল করছেন আমার চক্ষের পলক পড়তেছে না।’

‘জি খেয়াল করেছি। আপনার চোখ মাছেদের মতো।’

‘মাছের কথা বলবেন না, মাছ আমার দুচোখের বিষ। এই নিয়া আমার সংসারে আগুন।’

‘তাই নাকি?’

‘আমার দ্বিতীয় পরিবার হইল গিয়া মহারানি। মাছ ছাড়া তার এক বেলার ভাত ঢোকে না গলায়। এই দিক থেকে আমার প্রথম পরিবার খুবই ভালো—মাছের কোনো বালাই নাই। কিন্তু তার জবান খারাপ। গালিগালাজ ছাড়া কথা বলতে পারে না। সে গালি অতি কুৎসিত। আপনি শুনলে আপনার কান এক শ বার ধৌত করা লাগবে। শুনবেন?’

‘না, গালি শুনতে চাচ্ছি না।’

‘সেইটাই ভালো। ওই গালি বললে পাঁচ দিন জিহ্বায় সুয়াদ থাকে না। বজ্জাতের বজ্জাত মহিলা।’

‘মাছের কথা কী যেন বলছিলেন?’

‘দ্বিতীয় পরিবার অতি মাছপাগল। অল্প বয়স তো, অনর্থক লাফালাফি করে। অল্প পানির মাছ আরকি। পাঙাশ পেলে কাঁচা খাইয়া ফেলতে পারে এমন অবস্থা তার!’

‘এ তো সাংঘাতিক অবস্থা...’

উগান্ডার রাষ্ট্রপতি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি।

‘আপনে বিজ্ঞজন, আপনে বুঝতেছেন, সে বোঝে না। এই নিয়া একটা গানও আছে স্যার—বোঝে না, সে বোঝে না...গানটা কি শুনছেন?’

‘গান আমার শোনা হয় না।’

‘আগের মতো গানও তো হয় না স্যার। টিভি খুললেই কী সব দেখায়। শুনার মতন গান কই?’

‘আচ্ছা।’

‘এখন তো স্যার আরও সমস্যা। টিভি যে খুলব সেইটাতেও

লাগে ভয়।’

‘কেন?’

‘ওই যে স্যার বিল! গত মাস পর্যন্ত আমার কারেন্টের বিল আসত আড়াই শ টাকা। পরিবারের টিভি দেখার খাসলত। এই জন্য বিলটা বেশিই আসত। কিন্তু এই মাসে বিল কত আসছে দেখছেন?’

মিসির আলি বিলটা দেখার চেষ্টা করলেন।

‘দেখছেন স্যার বিল?’

‘১৬ হাজার ৯২ টাকা?’

‘জি স্যার। বলেন এইটা কি কোনো বিল স্যার? আমি বলছি, বাড়ির টিভি-ফ্যান সব বন্ধ! দ্বিতীয় পরিবার বলছে, এইগুলা বন্ধ হলে নাকি সংসার করবে না। সংসারের পিছনে লাত্থি মেরে চলে যাবে! গোস্তাখি মাফ করবেন স্যার, পিছন শব্দটা জবানে চলে আসছে!’

মিসির আলি তাকিয়ে থাকলেন শুধু।

‘এই বিলের একটা ব্যবস্থা কি করা দরকার না? আপনে বিজ্ঞ মানুষ, আপনে বিবেচনা করেন এই বিল দেখার পর থেইকা আমার দুই চোখ...’

মজিদ মিয়া খেয়াল করলেন, মিসির আলি তাকিয়েই আছেন।

‘স্যার স্যার, আপনে কি শুনতে পাইতেছেন?’

‘শুনতে পাচ্ছি মজিদ মিয়া।’

‘আপনে কি দেখতে পাইতেছেন স্যার?’

‘দেখতে পাচ্ছি মজিদ মিয়া।’

‘কিন্তু আপনের স্যার পলক পড়তেছে না। আপনের স্যার আমার মতোই পলক পড়তেছে না...’

‘আমি বুঝতে পারছি, আমার পলক পড়ছে না। বাংলা সাহিত্যে একে বলে অপলক অবস্থা। কিন্তু আমি জানি না এ অবস্থা থেকে আমরা ফেরত আসব কীভাবে? আমি জানি না, আমরা আবার এ রকম বিল দেখে পলক ফেলতে পারব কি না! নাকি ধীরে ধীরে আমরা সবাই পলক ফেলা ভুলে যাব?’

মিসির আলি ও মজিদ মিয়া পরস্পরের দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁদের মাঝে অদৃশ্য রুমালের মতো ঝুলতে থাকল এক ভুতুড়ে বিল। যার সংখ্যা শোনামাত্র আপনারাও হয়তো ভুলে যাবেন পলক ফেলতে।