ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বনানী ফুড কোর্টের নির্মিত আটটি দোকানকে কাগজে-কলমে ‘খালি জায়গা’ হিসেবে দেখিয়ে সরকারদলীয় এক বহিষ্কৃত রাজনৈতিক নেতার নামে বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাটি প্রশাসনিক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রশ্নটিই সামনে আনে। প্রচলিত আইন ও বিধিমালাকে উপেক্ষা করে এ ধরনের সুবিধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, প্রতি বর্গফুটের দৈনিক ভাড়া মাত্র দেড় টাকা নির্ধারণ করে প্রায় ৩০০ বর্গফুটের একটি নির্মিত দোকানের রূপক মাসিক ভাড়া ধরা হয়েছে মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। একই সঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া একটি চক্র নাকি সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন লাখ লাখ টাকা জামানত এবং মাসে ৬০ হাজার টাকা করে ভাড়া আদায়ের তোড়জোড় চালাচ্ছে। এতে সরকারি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে জনগণের সম্পদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার চিত্রই উঠে আসে।
সিটি করপোরেশনের বিধি অনুযায়ী, কোনো নির্মিত স্থায়ী অবকাঠামো বা দোকান বরাদ্দ দিতে হলে তা রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে উন্মুক্ত দরপত্র বা লটারির মাধ্যমে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক—যাতে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় নিশ্চিত হয় এবং প্রত্যেক নাগরিক সমান সুযোগ পায়। কিন্তু ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মকানুনকে পাশ কাটিয়ে দৃশ্যমান তৈরি দোকানকে ‘খালি জায়গা’ হিসেবে দেখিয়ে সম্পত্তির শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়িয়ে দলীয় প্রভাবশালীকে খাস–সুবিধা দেওয়ার অভিপ্রায়।
বিগত সরকারের আমলে এই ফুড কোর্ট তৎকালীন কাউন্সিলর ও স্থানীয় এক তাঁতী লীগ নেতার অবৈধ দখলে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় একদল বিএনপি ও যুবদল নেতার হাতে আসে। পরে সিটি করপোরেশন আইনি কাঠামোর দোহাই দিয়ে দখলদারত্বকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। রাজনৈতিক দল থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত এক নেতার লাইসেন্স ব্যবহার করে মূলত স্থানীয় যুবদল নেতারা আটটি দোকান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে খোদ বরাদ্দের আবেদনকারীই স্বীকার করেছেন। রাজনৈতিক দলের পরিচয় বদলালেও জনগণের সম্পদ লুটের চক্রান্ত একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে—এ নিয়ে হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এ ধরনের অনিয়ম ঢাকতে ডিএনসিসি কর্মকর্তাদের দেওয়া অজুহাতগুলোও অসংলগ্ন। ‘ফুড কোর্ট পরিচালনার নীতিমালা নেই’ বা ‘প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথ ফিটফাট রাখা’—এই ধরনের যুক্তি দিয়ে একটি দৃশ্যমান নির্মিত মার্কেট রাজনৈতিক নেতাদের হাতে তুলে দেওয়াটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় বহন করে।
এ অবস্থায় অবৈধ বরাদ্দ অবিলম্বে বাতিল করে স্বচ্ছ নীতিমালার আওতায় উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। সিটি করপোরেশনের সঠিক রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের সমান সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে; অনিয়মের পুনরাবৃত্তির কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না।