সন্ধ্যা নামতেই দিনটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। পুরান ঢাকার রাস্তাগুলো তখনও ভেজা ভেজা, তার ওপর দুপুরের বৃষ্টিতে ছাদও ভিজে আছে—জল জমে গেছে। ঘুম ভাঙে লোকনাথ দাসের। বৃষ্টির ভেতরেই সারা দিনের ক্লান্তি মিলিয়ে যায়, কিন্তু মনে গাঁথা থাকে এক অদ্ভুত টান—সন্ধ্যার এই সময়টা যেন আলাদা করে টানে তাকে।
লোকনাথের বয়স ২৯। তার নিজেরই হিসাব, হয়তো ৩৯+। আগে কবিতা লিখতেন। তবু কবিতা আর আগের মতো করেন না—লেখালেখি দিয়ে সংসারের খরচ জোগাড় করা কঠিন। পড়ালেখা করেছেন বাংলায়, ইংরেজিতেও দক্ষ। ডিপার্টমেন্টের স্যারের সুপারিশে চাকরি হয়েছে একটি প্রকাশনা সংস্থায়। সেখানে বই অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ করতে হয়।
নারিন্দায় থাকেন লোকনাথ। সাবলেটের এই বাসাটি যেন ছোট্ট এক পৃথিবী। শহীদুল জহিরের ‘দক্ষিণ মশুন্ডির’ ‘ভূতের গলিতে’—এই এলাকার গলি-ছায়ায় যে ঘরগুলো, সেখানে লোকনাথের ভাগ্যও যেন ঠিক সন্ধ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। ওই ঘরে পরিবার নিয়ে থাকেন রামশংকর আচার্য। একসময় লোকনাথের জন্য সাবলেট দিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটি ঘর।
রামশংকর আচার্য জ্যোতিষার্ণব। হস্তরেখাবিশারদ এবং কুষ্ঠী বিচারও করেন। তার স্ত্রী প্রভাবতী বউদি ইসলামপুর থেকে শাড়ি কিনে এনে বিক্রি করেন—যৎসামান্য লাভ হয়। আচার্য দম্পতি নিঃসন্তান। জ্যোতিষার্ণব গণনা করে দেখেছেন, প্রভাবতী পরিণত বয়সে দুইবার সন্তানবতী হবেন। প্রভাবতী বউদির বয়স এখন একচল্লিশ–বেয়াল্লিশ হবে। হাসিখুশি মানুষ প্রভাবতী বউদি। আর লোকনাথকে ডাকেন বাবা লোকনাথ।
বেশির ভাগ দিন সন্ধ্যায় দুজন বাসায় থাকেন না। তনুগঞ্জ লেনে চেম্বার আছে, সেখানে সন্ধ্যায় বসেন জ্যোতিষার্ণব। প্রভাবতী বউদি শাড়ির ব্যাগ নিয়ে বের হন। লোকের লাভটা তখনই—একাই বসে সন্ধ্যার রূপ দেখতে পারে সে। পুরোনো হলুদ রঙের তিনতলা বিল্ডিং; ঝরঝরে। তিনতলায় থাকেন আচার্যরা। দুই ‘কাইক’ দিয়ে ছাদে ওঠা যায়।
সেই ছাদেই একা বসে থাকে লোকনাথ। পুরান ঢাকা, সন্ধ্যা—অধিকতর রহস্যময়। সে নিজেও চাইছে না এই রহস্যের কিনারা হোক। সন্ধ্যার রহস্যময়তা যেন অমীমাংসিতই থাকে—এই ভাবনাই তার ভেতরে ঘুরতে থাকে।
২২ জুলাই বুধবার। ওই দিন বৃষ্টির পরে ছাদ ভিজে আছে। ঘুমে তার দেখা স্বপ্ন শুরু হয় ক্লাসরুমের জানালায়—কিন্তু স্বপ্নের ভেতরেই এক অন্যমাত্রা। আবদুর রহিম মধু স্যার তাকে ব্যাঙ হয়ে থাকতে বলেছেন—কুনিব্যাঙ না সোনাব্যাঙ ম্যানশন করেন নাই। তারপর স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আকাশ-ছায়ার মতোই ভেসে ওঠে কতগুলো চিন্তা। তার আর অত্রি সুরের একটি সম্পর্কের সম্ভাবনা নিয়েই সে ভাবতে থাকে।
অত্রি সুর অরবিন্দ সুরের দ্বিতীয় কন্যা? প্রথম কন্যা মৈত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে? লোক এসব কী ভাবছে? মাথামুথা গেছে? ছাদে কেউ উঠল। নারী জাতি। লোক তাকিয়ে দেখতে গেল না। মিষ্টি একটা ঘ্রাণে ভরে গেল ছাদ। সন্ধ্যার কিছু পাখি উড়ে গেল। ‘শুনছেন।’ চেনা কণ্ঠস্বর। লোক তাকাল। অত্রি সুর!
অফিসের কলিগ অত্রি সুর—কম্পিউটার সেকশনের একনিষ্ঠ কর্মী। ইদানীং লোকনাথের মাথায় তার সঙ্গে ঘিরে অযথাই নানা ভাবনা আসে। তবে বাস্তবে অত্রি সুর কিছুই জানে না, জানবে না। অফিসে দেখা হয়, কথা হয়—সেখানেই সীমা। সম্পর্কটা কুশল বিনিময়ের বাইরে কখনও যায়নি।
তবু লোকের মনে ভিড় করে কতগুলো দৃশ্য। অত্রি সুরকে নিয়ে তার কল্পনা এমনভাবে তৈরি হয় যেন স্বপ্নও বাস্তবের কাছাকাছি চলে আসে। একদিন নর্থব্রুক হল রোড দিয়ে অত্রি সুরের সঙ্গে রিকশায় যাচ্ছিল এক হারামজাদাকে—সেই ঘটনাও মনে পড়ে। লোক ভাবতে শুরু করে—স্বপ্ন যদি ভিডিও করা যেত, তাহলে হয়তো সবকিছুই ভাইরাল হয়ে যেত; অত্রি সুরও নিশ্চয়ই তা দেখত। আবার অন্যদিকে, শহীদুল জহিরের ‘ভূতের গলির’ সন্ধ্যায় কফির মগ হাতে ভেজা ছাদে বসে লোকনাথ হাজার বছর ধরে হাঁটছে—এমন এক আকাশকুসুম ভাবনাও ভেসে ওঠে।
তবু সে যখন কল্পনা থেকে বাস্তবের দিকে ফিরে আসে, তখনই ছাদে অত্রি সুর। লোক তাকায়—‘শুনছেন।’ পরে আবার ঠিক সেই কণ্ঠস্বরেই ডালপালা ছড়ায় কথার শুরু।
‘ওরে! ও তো আমার ছোড়দা। ছোড়দা কী রঙের ফতুয়া পরেছিল মনে রেখে বসে আছেন! আমি কী পরেছিলাম মনে করতে পারেন?’ ‘ফ্লোরাল প্রিন্টের কামিজ, গাঢ় নীল রঙের ওড়না, সবুজ রঙের সালোয়ার। চুলে কমলা রঙের গার্ডার।’ ‘ওররে!’
লোকের মাথায় তখনও পুরোটা বসে না। তবে সে বুঝতে পারে—সত্যিই অত্রি সুর।
সন্ধ্যা হয়। রহস্যময়। এ আবার নারিন্দা ভূতের গলির সন্ধ্যা—শহীদুল জহিরের ‘ভূতের গলি’। লোক বিস্ময় গোপন না করেই বলে, ‘আপনি! কফি খাবেন?’
অত্রি সুর হাসে। বলে, ‘দেন। খাই।’ লোক তার মগ বাড়িয়ে দিলে অত্রি সুর নেয়। এক চুমুক দিয়ে বলে, ‘এহ্! এত চিনি খান!’ লোক হেসে ওঠে।
অত্রি সুর এসেছে জ্যোতিষার্ণব রামশংকর আচার্যের কাছে। তার ভাইয়ের কুষ্ঠী বিচারও দেবার কথা ছিল। কিন্তু অত্রি সুরকে আচার্যের চেম্বারে পাওয়া যায়নি। ভেবেছিল, জ্যোতিষার্ণবের বাসা থেকে ভাইয়ের কুষ্ঠী নিয়ে যাবে। আচার্যের কার্ডে চেম্বার ও বাসার ঠিকানা আছে; নিচে কলবেলও দিয়েছে অনেকক্ষণ। জ্যোতিষার্ণবের মোবাইল ফোন বন্ধ। ছাদের গেইট খোলা দেখে সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে—এমন ভাবনা থেকে ছাদে উঠে পড়েছে। লোকনাথের মতে, সে ভালই করেছে; কিন্তু অত্রি সুর তার উপস্থিতি সম্পর্কে সেটাই বলে—
‘আপনাকে এখানে দেখব চিন্তা করি নাই।’
লোক হাসলে। বলে, ‘সাবলেট থাকি আপনার জ্যোতিষার্ণব মশাইয়ের বাসায়।’
অত্রি সুর জিজ্ঞেস করে, ‘সত্যি?’
লোক বলে, ‘না মিথ্যা। আমি মই বেয়ে মেঘে উঠছিলাম। আপনাকে দেখে মই থেকে লাফ দিয়ে এই ছাদে নেমে পড়েছি।’
অত্রি সুর খুব হাসে।
তারপর লোক জিজ্ঞেস করে, ‘সেদিন আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন?’
অত্রি সুর বলল, ‘কবে? কোন দিন?’
লোক বলল, ‘নর্থব্রুক হল রোড দিয়ে যাচ্ছিলেন রিকশায়, সাথে একটা ছেলে ছিল। চুল লম্বা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি–গোঁফ। সবুজ ফতুয়া পরে ছিল। সিগারেট টানছিল।’
অত্রি সুর বলে, ‘ওরে! ও তো আমার ছোড়দা। ছোড়দা কী রঙের ফতুয়া পরেছিল মনে রেখে বসে আছেন! আমি কী পরেছিলাম মনে করতে পারেন?’
লোক তখনও ঠিক সেই স্মৃতির হিসাব মিলিয়ে বলে, ‘ফ্লোরাল প্রিন্টের কামিজ, গাঢ় নীল রঙের ওড়না, সবুজ রঙের সালোয়ার। চুলে কমলা রঙের গার্ডার।’
‘ওররে!’
সন্ধ্যা হয়।রহস্যময়।
কফি শেষ।
লোক দুই ‘কাইক’ দিয়ে ছাদ থেকে নামল। জ্যোতিষার্ণব বা প্রভাবতী ফিরেছেন? ঘরে বাতি জ্বলছে। ধীরে–সুস্থে লোক কলবেল দিল। দরজা খুলে দিল অত্রি সুর।
এরপর কথার ধারায় সামনে আসে পরিবার-পরিচয়ের কিছু তথ্য। অত্রি সুরের বাবার নাম অরবিন্দ সুর। বড় বোনের নাম মৈত্রী সুর—তার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন অত্রি সুরের জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকাপ্রবাসী গোটা আষ্টেককে খারিজ করে দিয়েছে অত্রি সুর। বিদেশ যদি যায় ঘুরতে যাবে—কিন্তু বৈবাহিক সূত্রে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক না সে। দেশি পাত্র যারা, তারা বোরিং; ভীষণ মনোটনাস। রেস্টুরেন্টে ট্রিট দিতে চায় শুধু। আধা বাংলা আধা ইংলিশে কথা বলে।
লোক জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার তো দেখি কাউকে পছন্দ না?’
অত্রি সুর বলে, ‘আপনাকে পছন্দ।’
লোক জানতে চায়, ‘কী?’
অত্রি সুর বলে, ‘আপনি আমাকে বিয়ে করবেন? আমি আপনাকে বিয়ে করব।’
লোকনাথের মাথায় থাকে একটাই জিনিস—তারপর অত্রি সুর বিয়ে করে লোকনাথকে। নির্দিষ্ট সময়ে মেয়ে বিয়োলো। লোক সে সময় ছাদে বসে সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাতারা দেখছিল। তার মেয়ের নাম সে সন্ধ্যাতারা রাখল।
সন্ধ্যা হয় আবার। রহস্যময়। কফি শেষ। লোক দুই ‘কাইক’ দিয়ে ছাদ থেকে নামে। জ্যোতিষার্ণব বা প্রভাবতী ফিরেছেন? ঘরে বাতি জ্বলছে। ধীরে–সুস্থে লোক কলবেল দিল। দরজা খুলে দিল অত্রি সুর।