সৌরভ জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের একজন যোদ্ধা। ক্ষত সেরে গেছে। তবে রয়ে গেছে ক্ষতের চিহ্ন। স্প্লিন্টারগুলো তাঁর শরীর থেকে বের করা যায়নি।

.

গলার ডান পাশে ক্ষতটি প্রায় চক্রাকার এবং সেটি ডান হাতের কনুই পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ক্ষত সারাতে লাগানো হয়েছে সার্জিক্যাল স্ট্যাপল। আজহারুল ইসলাম সৌরভের এমন অবস্থার একটি ছবি রয়েছে। তখন তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সে সময়ের একটি এক্স-রে রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, অনেক স্প্লিন্টার বা ছররা গুলির চিহ্ন।

আজহারুল ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের একজন যোদ্ধা। তাঁর শরীর থেকে সার্জিক্যাল স্ট্যাপল খোলা হয়েছে। ক্ষত সেরে গেছে। তবে রয়ে গেছে ক্ষতের চিহ্ন। স্প্লিন্টারগুলোও তাঁর শরীর থেকে বের করা যায়নি।

লম্বা সময় চিকিৎসার একপর্যায়ে আজহারুলের পিঠ থেকে মাংস এনে গলার ক্ষতস্থানে লাগানো হয়েছিল; কিন্তু মাংস পচে যায়। পরে বুক থেকে মাংস নিয়ে লাগানো হয়। চামড়া নষ্ট হয়ে গেলে পা থেকে চামড়া এনে লাগাতে হয়। আজহারুল বলেন, ‘তখন যে ব্যথা হতো, তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না! শুধু যার হইছে, সেই বুঝতে পারবে!’

.

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন আজহারুল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁকে পিষে ফেলার জন্য শরীরের ওপর উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল র‍্যাবের একটি গাড়ি। ওই ঘটনার একটি ভিডিও তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় আজহারুলদের বাড়ি। গত রোববার মুঠোফোনে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। মুক্তকণ্ঠকে তিনি জানান, সেদিনই (১৮ জুলাই) প্রথম আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য উত্তরায় মামার বাসায় গিয়েছিলেন। মামাতো ভাই, বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পনা করেই গিয়েছিলেন। তারপর কীভাবে গুলি লাগে, কীভাবে তাঁকে উদ্ধার করা হয়—কিছুই মনে নেই। হাসপাতালে দুই দিন পর জ্ঞান ফিরেছিল। দীর্ঘদিন পর ফেসবুকে জুলাই রেভোল্যুশনারি অ্যালায়েন্স গ্রুপে শেয়ার হওয়াসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাইরাল হওয়া সেদিনের ভিডিও দেখেছেন। কেননা হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। বাড়ি ফিরলেও বলা যায় ঘরবন্দীই থাকতে হতো, এখনো অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

.

আজহারুল বলেন, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তিনি প্রথম যেখানে লুটিয়ে পড়েছিলেন, সে জায়গায় রক্তের পাশে তাঁর ক্যাপ পড়ে রয়েছে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি মাদ্রাসায় ফাজিলের শিক্ষার্থী ছিলেন। আহত হওয়ার পর পড়াশোনা হয়নি আর। এখন বাড়িতেই থাকেন, বাবাসহ অন্যদের টুকটাক কাজে সহায়তা করেন।

আজহারুল বলেন, ছয় মাস কথা বলতে পারেননি। এখনো উচ্চ স্বরে কথা বলতে পারেন না। ডান হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত একটু নাড়াতে পারেন, তবে তেমন কোনো কাজ করতে পারেন না। শরীরের ব্যথা, কিছু করতে না পারা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় মানসিক যন্ত্রণা তো আছেই।

আজহারুল যখন আন্দোলনে গিয়ে আহত হন, তখন তাঁর স্ত্রী মৃদুলা আক্তার ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে এক মেয়েসন্তানের জন্ম দেন। নাম রেখেছেন মাইশা। এ ছাড়া আরেক মেয়ে আছে তিন বছরের, নাম আয়শা।

.

বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন সবাই

আহত হওয়ার পর আজহারুল চিকিৎসা নিয়েছেন কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল ও ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। সিএমএইচে সরকারিভাবে চিকিৎসা পেলেও এর আগে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিল আসে ১৬ লাখ টাকার বেশি। জমি বিক্রি করাসহ নানাভাবে এ টাকা জোগাড় করে পরিবার।

বিভিন্ন হাসপাতালের নথিতে আজহারুলের গলায় ‘গানশট ইনজুরি’র পাশাপাশি ‘ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন ইনজুরি’র কথা লেখা আছে। ইন্টারনাল জুগুলার ভেইনে আঘাত বা ইনজুরি হচ্ছে, ঘাড়ের একটি অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থা, যা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে বা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এটি মূলত ধারালো অস্ত্রের আঘাত, দুর্ঘটনা বা চিকিৎসাপদ্ধতিগত জটিলতার কারণে হতে পারে।

আজহারুল জানান, ইউনাইটেড হাসপাতালে ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তিনি বাঁচবেন, সে আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘আমি অলৌকিকভাবে এখনো বেঁচে আছি।’

.

‘গলা চেপে ধরি, যাতে রক্ত বের হতে না পারে’

আজহারুলকে উদ্ধার করে সেদিন হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন এইচবিএইচ ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কলেজের সে সময়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাফিন আহমেদ রবিউল। বর্তমানে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

রাফিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, উত্তরার জমজম টাওয়ার থেকে সেদিনের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বিএনএস টাওয়ার থেকে আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগোনোর সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্র–জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। ছাত্র–জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল মারছিল। পুলিশ গুলি করছিল। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলছিল। পুলিশ-র‍্যাবের গাড়ি মাঝে মাঝেই জনতাকে পিষে মারার চেষ্টা করছিল।

রাস্তার মাঝখানে আহত একজনকে (আজহারুল) ধরে কয়েকজন তোলার চেষ্টা করছিলেন উল্লেখ করে রাফিন বলেন, হঠাৎ র‍্যাবের একটি গাড়ি উল্টো দিকে চালিয়ে সেখানকার মানুষগুলোকে দ্রুত চাপা দিয়ে চলে যায়। কয়েকজন ছিটকে সরে যান। তবে আহত ব্যক্তি সে অবস্থায় ছিলেন না। তাঁর ওপর দিয়েই গাড়িটি চলে যায়। পরে ছাত্র–জনতা ধাওয়া দিয়ে গাড়িটি ধরে ফেলে এবং গাড়িচালককে মারধর করে গাড়িটি ভেঙে দেয়।

.

রাফিন বলেন, ‘কাছে গিয়ে দেখি আহত ব্যক্তির গলার অর্ধেক প্রায় কেটে গেছে। নার্সিং কলেজের স্টুডেন্ট, তাই সেই মুহূর্তে মনে হয়েছে, যে করেই হোক এই ব্যক্তিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। হাত দিয়ে গলা চেপে ধরি, যাতে রক্ত বের হতে না পারে। সেখানে একটি তালা দেওয়া ভ্যান ছিল, ইট দিয়ে কয়েকজন তালা ভাঙেন। ভ্যানে ওই ব্যক্তির মাথা কোলে নিয়ে বসি, যাতে জ্ঞান না হারান সে চেষ্টা করতে থাকি। তখনো বুঝতে পারিনি এই ব্যক্তির গায়ে গুলিও লেগেছে। কাছের
কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেওয়া হয়।’

চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর ওই ব্যক্তির পকেটে থাকা ছোট একটি বাটন ফোন থেকে কল করে পরিবারকে রাফিন জানান, এ ফোন যাঁর, তিনি হাসপাতালে আছেন। তখন রাফিন জানতে পারেন আহত ব্যক্তির নাম আজহারুল ইসলাম সৌরভ। পরিবারের সদস্যরা আসার পর রাফিন হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে যান।

রাফিন সেদিন তাঁর মুঠোফোনে কিছু ভিডিও করেছিলেন। সেগুলো মুক্তকণ্ঠকে পাঠিয়েছেন। সেগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আজহারুলের গলা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সেদিন কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চারজনের লাশের ভিডিও ধারণ করেছিলেন তিনি।

রাফিন বলেন, ‘সৌরভকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়। পরে আমার নম্বরে ফোন করেন। গাজীপুরে সৌরভদের বাড়িতে দাওয়াত দিলে আমরা বন্ধুরা মিলে গিয়েছিলাম।’

.

‘স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি’

বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে মামলা করারও ফুরসত পাননি আজহারুল। আক্ষেপ করে বলেন, আন্দোলনে গিয়ে গুরুতর আহত হলেও প্রথমে ‘সি’ ক্যাটাগরির আহত যোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটে নাম ওঠে। তবে এরপর আবেদন করলে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে নাম তোলা হয়। সরকারি আর্থিক সহায়তা পাঁচ লাখ টাকা এবং বর্তমানে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন এক লাখ টাকা।

আজহারুলের কাছে প্রশ্ন ছিল—আন্দোলন থেকে কী পেয়েছেন? উত্তরে বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে গিয়েছিলাম, তা পূরণ হয়নি। হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’