আগামী নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ছেলেদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জাতীয় দলের কোচ টমাস ডুলির জন্য প্রথম বড় টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্ট এবং বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠের সাথে কথা বলেছেন তিনি। জহির উদ্দিনের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ডুলি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি, দল নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের কথা জানিয়েছেন।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে কোচ টমাস ডুলি বলেন, "এটা বড় বড় কথা বলার সময় নয়। তবে লক্ষ্যটা পরিষ্কার—সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমে শিরোপার জন্য লড়াই করা।"
২৩ বছরের শিরোপাখরা ভাঙার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি জানান, নিজেদের মাঠে টুর্নামেন্ট আয়োজন করা একটি বিশাল সুবিধা এবং তা কাজে লাগাতে হবে। সান মারিনোর বিপক্ষে জয় দলের জন্য একটি ভালো ভিত তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি। তবে সামনের মাসগুলোতে কৌশল, দক্ষতা, সেট পিস এবং দলের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতিগুলো মেটানোর পাশাপাশি মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে খেলোয়াড়দের।
গ্রুপের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, ভুটান এবং সম্ভাব্য নেপাল সম্পর্কে ডুলির মন্তব্য, "প্রতিপক্ষ কে, সেটা বড় কথা নয়। চ্যাম্পিয়ন হতে হলে সহজ–কঠিন ভুলে যান। শিরোপা জিততে হলে সামনে যে-ই আসুক, তাকে হারাতে হবে। প্রতিটা ম্যাচে জেতার মানসিকতা নিয়ে নামতে হবে।"
বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে খেলোয়াড়দের আবেগ আর নিষ্ঠা। মাঠে দরকারের সময় তারা সব উজাড় করে দেয়, লড়াই করে, দলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। মাঠের বাইরে দারুণ বিনয়ী, আন্তরিক, দলকেন্দ্রিক। সবাই শিখতে চায়, অন্যকে সম্মান দেখায়, মানসিকতাও ইতিবাচক। হৃদয় দিয়ে খেলা আর বিনয়—এই মিশেলটাই তাদের শেখার জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে, আর এটাই আমাকে বাংলাদেশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী করছে।"
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-১৬০ এর মধ্যে যাওয়ার লক্ষ্য অর্জনে ডুলি একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, "কয়েকটি জায়গায় জোর দিতে হবে। এমন প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে হবে, যা প্রস্তুতি আর র্যাঙ্কিং—দুটোতেই কাজে দেয়। বাছাইপর্ব আর আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিততে হবে। কারণ, ওখানে পয়েন্ট বেশি। ম্যাচে ভুল কমাতে হবে, কৌশলগত শৃঙ্খলা রাখা জরুরি, সেট পিসে আরও কার্যকর হওয়া দরকার। একটা স্থিতিশীল মূল স্কোয়াড দাঁড় করাতে হবে, যাতে খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। মাঠের বাইরেও কাজ করার আছে। দেশ ও বিদেশ দুই জায়গা থেকেই প্রতিভা খোঁজা, একাডেমিকে শক্তিশালী করা, প্রশিক্ষণ-স্পোর্টস সায়েন্স-ভিডিও বিশ্লেষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। সব মিলিয়ে কোচিংয়ে ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও দরকার।"
প্রবাসী ফুটবলারদের বিষয়ে তার স্পষ্ট মতামতে তিনি বলেন, "যাদের বাংলাদেশের সঙ্গে সত্যিকারের রক্তের সম্পর্ক নেই, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সূত্রে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যোগসূত্র আছে, তাদের অবশ্যই দেশের হয়ে খেলার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। প্রতিন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়েরা সাধারণত উন্নত প্রশিক্ষণ, কৌশলগত জ্ঞান আর পেশাদারত্ব নিয়ে আসে। তারা ভালো করলে তরুণেরা ফুটবলে আগ্রহী হন, বিনিয়োগ-স্পনসর বাড়ে, ঘরোয়া লিগও শক্তিশালী হয়। ফিলিপাইনের কথা বলি। শুরুতে আমরা অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় নিয়েছিলাম দলের মান বাড়াতে। স্থানীয়দের মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশভিত্তিক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা কমেছে, নির্বাচন হয়ে ওঠে পুরোপুরি মেধাভিত্তিক। বাংলাদেশেও একই নীতি প্রয়োজন। প্রবাসী খেলোয়াড়কে স্থানীয়দের চেয়ে ভালো হতেই হবে, জায়গা অর্জন করতে হবে পারফরম্যান্স দিয়ে।"
ঘরোয়া কাঠামোর দুর্বলতা এবং জাতীয় দলের দর্শন নিয়ে ডুলি বলেন, "না। আমার তাই চাওয়া, জাতীয় দল থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক সব দল একই দর্শন মেনে চলুক, যাতে খেলোয়াড়েরা ছোটবেলা থেকেই একই পদ্ধতি আর নীতিতে বেড়ে ওঠে।"
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি সারা দেশের জন্য একটি অভিন্ন কোচিং কারিকুলাম চালু করতে চান। আঞ্চলিক উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন এবং অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে সিনিয়র দল পর্যন্ত একটি স্বচ্ছ পথ তৈরির কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি কোচদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন কোচ।
নতুন প্রতিভা অন্বেষণের ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝিয়ে তিনি বলেন, "অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মূল্য অনেক। ভালো নেতৃত্ব দলের জন্য জরুরি, তাঁরা দীর্ঘদিন খেলতেই পারেন। তবে নতুনদের উঠে আসাটাও জরুরি। আমি মনে করি, ৬ থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বয়সটা খেলা উপভোগের সময়। এ সময় ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। ১১ থেকে ১৪—দক্ষতা গড়ার সবচেয়ে জরুরি সময়। এই সময়ে দরকার সঠিক প্রশিক্ষণ। ১৫ থেকে ২০—কৌশলগত শিক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়া আর খেলা বোঝার ক্ষমতা বাড়ানোর সময়। আমি সব সময় চারটা স্তম্ভের কথা বলি—প্রযুক্তিগত, কৌশলগত, শারীরিক আর মানসিক। অনেকে প্রথম তিনটাতেই জোর দেন, কিন্তু আসল পার্থক্য গড়ে দেয় মানসিক দৃঢ়তা। এই চারটি একসঙ্গে গড়ে তুলতে পারলেই খেলোয়াড়েরা পেশাদার পর্যায়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে।"
সবশেষে দল নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে ডুলি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, "আমার কাছে নির্বাচন মানে পারফরম্যান্স; বয়স, উচ্চতা বা খ্যাতি নয়। অনুশীলন আর ম্যাচে যে ভালো করবে, সে-ই সুযোগ পাবে। নাম-পরিচয় দিয়ে দলে ঢোকা যাবে না, যোগ্যরাই জায়গা পাবে। স্বীকার করছি, দেশের সব খেলোয়াড়কে এখনো আমি চিনি না, শুরুতে হয়তো এক-দুজন চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তবে নিয়মিত স্কাউটিং চলছে, যাকেই যোগ্য মনে হবে, তাকে পরের ক্যাম্পে ডাকা হবে।"