কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর বেশ কয়েক দিন পার হলেও তা এখনো সচল করা সম্ভব হয়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম শহরে, যেখানে বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। গৃহস্থালি রান্নাবান্না থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা—সবখানেই দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রভাব।

নগরের হালিশহর, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, পতেঙ্গা ও অক্সিজেনসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাসের অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। হালিশহরের বাসিন্দা আয়েশা বেগম জানান, "সকালে সন্তানের স্কুলের টিফিন বানাতে গিয়ে দেখেন গ্যাস নেই।"

অন্যদিকে অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা পলি জানান, সারাদিন গ্যাস না থাকায় বিকেল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করে সন্ধ্যার দিকে তাদের খাবার প্রস্তুত করতে হয়েছে। হালিশহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তারা গ্যাস নিয়ে ভোগান্তির শিকার। আগে দুপুরের দিকে কিছুটা চাপ পাওয়া গেলেও বর্তমানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্নার মতো পরিবেশ থাকছে না, ফলে তাদের দৈনন্দিন রুটিন পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে পড়েছে।

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ বর্তমানে তলানিতে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত কেজিডিসিএল প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৬৬ শতাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এবং দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ঘনফুটে।

সরবরাহের এই বিশাল ঘাটতি সামাল দিতে শিল্পকারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং আবাসিক খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, টার্মিনাল পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।

চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহের প্রধান উৎস হলো মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল—একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘এক্সিলারেট এনার্জি’ এবং অন্যটি ‘সামিট এলএনজি’ দ্বারা পরিচালিত। এই দুটি টার্মিনাল থেকেই জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্যাস আসে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর দৈনিক ১০০-১০৫ কোটি ঘনফুটের স্বাভাবিক সরবরাহ কমে ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিদ্যুৎ ও সার কারখানায়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে পরিচালনা প্রতিষ্ঠানটি আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে।

বারবার এমন সংকটের পুনরাবৃত্তি হলেও কেজিডিসিএলের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের আগেভাগে সতর্ক করার বা বিজ্ঞপ্তির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কোন এলাকায় কখন গ্যাসের চাপ কেমন থাকবে, তা না জেনে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) জানিয়েছে, টার্মিনাল মেরামতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ইতিমধ্যে পৌঁছেছে। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা দ্রুত টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালুর চেষ্টা করছেন। এটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে, যা বর্তমান সংকট কিছুটা লাঘব করবে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "বিশেষজ্ঞ দল দিনরাত কাজ করছে। অক্ষত বয়লারটি দ্রুত চালুর চেষ্টা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস-সংকট পুরোপুরি কাটবে না।"