শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জেরবার হওয়ার দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তিন রাজ্যের বিধানসভার তিনটি আসনের উপনির্বাচনের ফল। বিহারের বাঁকিপুরে দলটির অবস্থান ধরে রাখতে না পারার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিহারের বাঁকিপুর কেন্দ্রের উপনির্বাচনে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীনের ছেড়ে দেওয়া আসনে বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহা। এ ক্ষেত্রে তাঁকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর। প্রশান্ত কিশোর সারা দিশে ‘পিকে’ নামে বেশি পরিচিত।
আজ সোমবার বিকেল চারটা পর্যন্ত আসা ফল অনুযায়ী, প্রথমবার ভোটে দাঁড়িয়ে পিকে এগিয়ে রয়েছেন ১৫ হাজার ভোটে। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহা। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) প্রার্থী রেখা কুমারী কোনো লড়াই-ই দিতে পারেননি। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার।
মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসনেও বিজেপির জন্য চিত্রটা আশানুরূপ নয়। কেন্দ্রটি কংগ্রেসের দখলে থাকলেও বিজেপি নেতৃত্ব তা ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পছন্দের প্রার্থী ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছেন কংগ্রেসের কাছে। বিকেল চারটায় কংগ্রেসের প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং এগিয়ে রয়েছেন ৯ হাজার ভোটে। বিজেপির মুখ রক্ষা ও মান বাঁচানোর কাজটি করেছে গুজরাটের মঞ্জলপুর। আগের নির্বাচনে এই আসনটি তারা জিতেছিল লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। বিকেল চারটায় তাদের এগিয়ে যাওয়ার ব্যবধান ২৭ হাজার।
উপনির্বাচন নজর কেড়েছিল তেলাপোকা উত্থানকে কেন্দ্র করে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) রাতারাতি মাথাচাড়া দেওয়া, তাদের দাবির মুখে প্রবল প্রতাপান্বিত নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতজানু হওয়া এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করার পর এই প্রথম দেশে কোনো নির্বাচন হলো। স্বাভাবিকভাবেই নানা পর্যবেক্ষণ থেকেই বোঝার চেষ্টা ছিল, তিন রাজ্যে ‘জেন–জির’ সমর্থন কোন দিকে যায়।
বিধানসভার তিন আসনে উপনির্বাচন হয় গত ৩০ জুলাই। বিহারের বাঁকিপুর কেন্দ্রকে সামনে এনে দেখার পেছনে একাধিক কারণ ছিল। ওই কেন্দ্রটি বরাবর বিজেপির দুর্গ বলে পরিচিত। পরপর পাঁচবার সেখান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন নীতীন নবীন, যিনি এখন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। বিধানসভা ছেড়ে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন বলেই সেখানে উপনির্বাচন হলো। নীতীনের আগে ওই কেন্দ্র থেকে জিতে তিনবার বিধায়ক হয়েছিলেন তাঁরই বাবা নবীন কিশোর। এর প্রেক্ষাপটে বিজেপির কাছে বাঁকিপুর ধরে রাখা ছিল সম্মানের লড়াই।
এর পাশাপাশি, নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রীর পদে ছেড়ে কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পর এই প্রথম বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদ দখল করল বিজেপি—নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর নেতৃত্বে এইটাই ছিল প্রথম ভোট। পাশাপাশি বিজেপিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া জোটের’ ক্ষেত্রেও বাঁকিপুর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাঁকিপুরে প্রার্থী দিয়েছিল রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়া জোটের বড় শরিক আরজেডি। তবে প্রশান্ত কিশোরের উপস্থিতি বিরোধী মেরুকরণের পক্ষে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আলোচনায় ছিল।
বিধানসভার নির্বাচনে দল গঠন করে প্রশান্ত কিশোর ভোটে লড়েছিলেন, তবে আলোড়ন তুললেও তাঁর দল পর্যুদস্ত হয় এবং একটা আসনও জিততে পারেনি। বিধানসভার ভোটে প্রশান্ত নিজে লড়েননি। কিন্তু এবার নিজেই এগিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ জানালেন বিজেপি তথা এনডিএ জোটকে। ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর জন্ম হয় তেলাপোকা আন্দোলনের। দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাস ধরে অবস্থান করে শিক্ষার্থী সমাজ শাসক বিজেপির বিরুদ্ধাচরণ করেছে। নতুন রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে। ফলে আগ্রহ ছিল—বিজেপি-জেডিইউয়ের সাংগঠনিক শক্তিকে ছাপিয়ে ‘জেন–জি’ নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের পাশে সমর্থনের ডালি নিয়ে দাঁড়ায় কি না।
মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসন নিয়ে প্রেক্ষাপটে বলা হচ্ছে—২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী রাজেন্দ্র ভারতী সাড়ে ৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিজেপির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্রকে। এবার জয়ের ব্যবধান হতে পারে আরও বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। গত এপ্রিল মাসে জালিয়াতি মামলায় রাজেন্দ্র ভারতীর তিন বছরের সাজা হওয়ায় তিনি আইন অনুযায়ী বিধায়কের পদ হারান। উপনির্বাচনে বিজেপি টিকিট দেয় আশুতোষ তিওয়ারিকে, বিদ্রোহ করেন নরোত্তম মিশ্র। পরে অবশ্য তিনি দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে প্রচার করেন।
গুজরাটের মঞ্জলপুর কেন্দ্রটিও আলোচনায় ছিল। বিজেপির দখলে থাকা এই কেন্দ্রটিতে উপনির্বাচন হয় বিধায়কের মৃত্যুর কারণে। ২০২২ সালে ওই কেন্দ্রটি বিজেপি জিতেছিল এক লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে। সেই তুলনায় এবার জয়ের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
জন সুরাজ দল বলেছে, নতুন যুগের সৃষ্টি হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ডেরেক ওব্রায়ান সরাসরিই জানিয়ে দিয়েছেন, শেষের শুরু।