ডোরবেল বাজল। তাসনিয়া মিস প্রশ্ন নিয়েই ব্যস্ত—সামনেই পরীক্ষা। এর মধ্যে বারবার ছোটখাটো ঝামেলা জমে ওঠে।

আবার ডোরবেল বেজে উঠতেই কেউ দরজা খুলল না। ছেলে–মেয়ে যে যার ঘরে, সবার ভেতর এক ধরনের রুটিন-করা নীরবতা। তাসনিয়া মিস নিজেই গিয়ে দরজা খুলল।

দরজা খুলে তাসনিয়া মিস থমকে গেলেন। জেনিফার এসেছেন—জেনিফার আমাদের চাচাতো বোন, তার ডাকনাম চপল। তিনি আর আমাদের সহোদরা কনক একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। চপলও শিক্ষকতা করেন। জেনিফার এমন রাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন যে তার পুরো শরীর যেন কাঁপছে।

তাসনিয়া মিস জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘটনা কী?’

জেনিফার বললেন, আজ গণিতের সারপ্রাইজ টেস্ট হয়েছে। বোর্ডে অঙ্ক লিখে তার ওপর লেখা ছিল, ‘সমাধান করো।’

ক্লাসের হিন্দোল নামের এক ছাত্র খাতায় লিখেছে—‘নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করেন। কত দিন আর এভাবে নিজের সমস্যা ছাত্রদের দিয়ে সমাধান করাবেন? আপনি তো অঙ্কই ভুলে যাবেন একদিন!’

শিক্ষকের সামনে হিন্দোলের লেখা শুনে জেনিফার মিস স্থির হয়ে যান। ক্লাস শেষে রাগের ভেতরেই তিনি সোজা তাসনিয়া মিসের কাছে চলে আসেন।

তাসনিয়া মিস তখন জেনিফার মিসকে ঘরে বসালেন। ঘরে বসিয়ে জেনিফারকে তিনি নিজের কয়েকটি ঘটনা বললেন—

এক। ক্লাসে তাসনিয়া মিস সাধারণ জ্ঞান পড়াচ্ছেন।

তাসনিয়া মিস: ‘বল্টু, বলো তো, ফোর্ড কী?’

বল্টু: ‘খুব সোজা, মিস। ফোর্ড মানে গাড়ি।’

তাসনিয়া মিস: ‘তাহলে এবার বলো, অক্সফোর্ড কী?’

বল্টু: ‘এটা আরও সোজা, মিস। গরুর গাড়ি!’

দুই।

তাসনিয়া মিস: ‘বল্টু, তুমি কি জানো লেখাপড়া ছাড়া কখনো ডিগ্রি লাভ করা যায় না?’

বল্টু: ‘আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, মিস।’

তাসনিয়া মিস: ‘কেন? তোমার কি এ বিষয়ে ভিন্ন কোনো মতামত আছে?’

বল্টু: ‘মিস, থার্মোমিটার তো লেখাপড়া জানে না। তাও তো তার ডিগ্রি আছে।’

তিন।

তাসনিয়া মিস: ‘বল্টু, বল তো হাসা’র ইংরেজি প্রতিশব্দটি কী?’

বল্টু: ‘লাফ।’

তাসনিয়া মিস: ‘তাহলে হাসাহাসি’র ইংরেজি কী হবে?’

বল্টু: ‘লাফালাফি, মিস।’

দুই মিসের গল্প শুনে জেনিফার মিসের মনে হয়—এই পৃথিবীতে কেবল তিনিই নয়, তার মতো আরও অনেক দুঃখী মানুষ আছে। তারা দুজনই নিজ নিজ মতো। ক্লাসে বল্টু আর হিন্দোলকে সামলাচ্ছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেও তাদের আবার দেখা হয়ে যায়।

তারা দুজন একসঙ্গে একই কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। ভোটারের লম্বা লাইন, বেলা বাড়ছে, গরমও বাড়ছে। তাসনিয়া মিস বলেন, ‘তুই তো জানিস, আমি ভোট দেব কুলা মার্কায়। আর তুই দিবি মুলা মার্কায়। তাহলে আমাদের ভোট কাটাকাটি করে সমান হয়ে গেল। চল বাসায় যাই।’

তাসনিয়া মিসের কথায় যুক্তি আছে বলে মনে হয় জেনিফার মিসের। দুজন বাসায় ফেরার জন্য রওনা হন।

কিছুক্ষণ পর বল্টুর বড় ভাই সন্টুর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি হালকা হাসছেন—হাসির ভেতর হলুদ দাঁত স্পষ্ট। জেনিফার মিস জানতে চান, ‘হাসাহাসির ঘটনা কী?’

সন্টু জানান, ‘মিস, আপনাদের ওই ভোট কাটাকাটির বুদ্ধি আমার পছন্দ হয়েছে। বেশি পছন্দ। আমি চারজনের সঙ্গে এই ভোট কাটাকাটির খেলা খেলেছি।’

এরপর জেনিফার মিস তাসনিয়া মিসকে ডাকেন, ‘এখুনি চল, ভোট দিয়ে আসি।’

সন্টু যাতে আর ভোট কাটাকাটি খেলা করতে না পারে সে কারণে তাকে আপাতত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রাখা হয়েছে।

নতুন উদ্যোমে ক্লাসে পড়াশোনা শুরু হয়। শিক্ষামন্ত্রী করিতকর্মা মানুষ। তিনি শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন।

জেনিফার মিস ক্লাসে গিয়ে চোখ ঘুরিয়ে সবার দিকে তাকান। সবাই তখন শান্ত। তবে তার দৃষ্টি আগুনগরম। হিমশীতল গলায় তিনি বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে বল, তোমাদের প্রিয় ব্যক্তি কে?’

কেউ নিজের মায়ের কথা বলে, কেউ বাবার কথা, কেউ দাদার, কেউ মামা, কেউ চাচা। হিন্দোল জবাব দেয়—‘মিস, আমার প্রিয় ব্যক্তি হচ্ছেন আপনি।’

জেনিফার মিস বিস্মিত হন, ‘আমি কেন তোমার প্রিয় ব্যক্তি?’

হিন্দোলের উত্তর, ‘আপনাকে দেখে একটুও ভয় লাগে না। আপনি একদম রাগ করেন না।’

শীতের শেষ বিকেলের সূর্যের মতো নরম হয়ে আসা অনুভূতিতে জেনিফার মিস বলেন, ‘আজ আর পড়া নয়। এসো গল্প করি। হিন্দোল, তুমি বড় হয়ে কী হবে?’

হিন্দোল বলে, ‘লেখক হব, মিস।’

তারপর আবার সেই প্রশ্ন—‘তুমি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা বই পড়েছ?’

হিন্দোল বলে, ‘না, মিস।’

জেনিফার মিস বলেন, ‘তুমি সুকুমার রায়ের লেখা বই পড়েছ?’

হিন্দোলের উত্তরও একই—‘না, মিস।’

একদিন ক্লাসে তাসনিয়া মিস বলেন, ‘সবাই খাতা বের করো।’

বল্টু চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে খাতা নেই। শিক্ষক জানতে চান, ‘ঘটনা কী, বল্টু? তোমার খাতা কোথায়?’

বল্টু বলে, ‘মিস, খাতা বাসায় খুব নিরাপদ জায়গায় রেখে দিয়েছি।’

এরপর হিন্দোল বলে—‘না, মিস।’

‘সত্যজিৎ রায়?’

‘না, মিস।’

‘শামসুর রাহমান?’

‘না, মিস।’

‘আল মাহমুদ?’

‘না, মিস।’

জেনিফার মিস মন্তব্য করেন, ‘তুমি তো দেখছি কারও লেখাই পড়োনি!’

হিন্দোল বলেন, ‘মিস, আমি তো পাঠক হতে চাই না, আমি চাই লেখক হতে।’

এই ঘটনার পর ক্লাসে জেনিফার মিস আরও সিরিয়াস হয়ে ওঠেন। অঙ্ক ক্লাস চলতে থাকে। তিনি বলেন, ‘হিন্দোল, দাঁড়াও।’

হিন্দোল দাঁড়ালে শিক্ষক বলেন, ‘মনে করো, একজনের এক হাতে দশটা আপেল। আর আরেক হাতে দশটা আপেল। তাহলে পুরোটা মিলে কী পাওয়া গেল?’

হিন্দোল উত্তর দেন, ‘মিস, পুরোটা মিলে এটাই পাওয়া গেল যে ওই ব্যক্তির হাত খুব বড়। যার এক এক হাতে দশটা করে আপেল আটতে পারে।’

তাসনিয়া মিসকে জেনিফার মিস এই ঘটনা জানান। আর তখন তাসনিয়া মিস ক্লাসের শুরুতে স্টুডেন্টদের নাম ডাকছেন।

তাসনিয়া মিস বলল, ‘ঝন্টু!’

উত্তর এল, ‘ইয়েস মিস।’

তারপর নাম ডাকলেন—‘বল্টু!’

উত্তর এল, ‘প্রেজেন্ট মিস।’

‘পল্টু!’

উত্তর, ‘ইয়েস মিস।’

কিন্তু সামনে তাকিয়ে তাসনিয়া মিস পল্টুকে দেখতে পান না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘ইয়েস মিস কে বলল?’

বল্টু বলে, ‘পল্টু বলেছে, মিস।’

তাসনিয়া মিস জানান, ‘পল্টুকে তো দেখছি না!’

বল্টুর ব্যাখ্যা, ‘পল্টু ক্লাসে নেই, মিস। তবে পল্টু গতকাল বাড়ি যাওয়ার সময় তার গলার আওয়াজ ক্লাসে রেখে গেছে।’

এই পাশাপাশি ঘটনা দুটির পর জেনিফার মিস আর তাসনিয়া মিস মনের দুঃখে একরকম বনবাসের ভেতর চলে যান। বনবাসে গিয়ে তারা ক্লাসের স্মৃতি মনে করেন।

একদিন ক্লাসে তাসনিয়া মিস আবার বলেন, ‘সবাই খাতা বের করো।’

বল্টু চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে খাতা নেই। শিক্ষক জিজ্ঞেস করেন, ‘ঘটনা কী, বল্টু? তোমার খাতা কোথায়?’

বল্টু বলেন, ‘মিস, খাতা বাসায় খুব নিরাপদ জায়গায় রেখে দিয়েছি।’

এরপর বল্টু ব্যাখ্যা করে একটি কথা বলেন।

বল্টু বলল, ‘তাসনিয়া মিস আর জেনিফার মিস দুজনের কেউই কোথাও নেই। ইশকুল আর পাঠ্যবই থাকলেই কি আর না থাকলেই কি!’ কী বলব বুঝতে পারলাম না। চুপচাপ চলে এলাম। বল্টু আর হিন্দোল আবার গভীর মনোযোগ দিয়ে মেসেজ, স্ট্যাটাস আর কমেন্ট পড়তে থাকল।

তাসনিয়া মিস বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘কোথায় রেখেছ?’

বল্টুর উত্তর, ‘মায়ের আলমারিতে। সেখান থেকে কিছু বের করা আমার কেন, আমার বাবারও সাধ্য নেই। সবার ক্ষমতার বাইরে।’

জেনিফার মিসও একদিন অঙ্ক ক্লাসে হিন্দোলের পাশে বসান রিমিকে। হিন্দোল ফিসফিস করে রিমিকে কিছু বলেন। জেনিফার মিস স্পষ্ট করে দেন, ‘তোমাদের কিছু জানার থাকলে আমাকে জিজ্ঞেস করবে। অন্য কাউকে কিছু বলবে না।’

হিন্দোল তখনই বলে ফেলেন—‘মিস, আজ রাতে কি আপনি আমার সঙ্গে সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখতে যাবেন?’

তিনি পাশে বসা রিমিকে বলেছিলেন সেই কথাই। আর জেনিফার মিস যখন বলেছিলেন অন্য কাউকে না বলে তাঁকে জানাতে হবে, তখন সেই কথাও হিন্দোল সঙ্গে সঙ্গে বলে দেন।

এভাবে জমে থাকা ভালোবাসা ধরে রাখতে গিয়ে তাসনিয়া মিস আর জেনিফার মিস আর বনবাসে থাকতে পারেননি। তারা ফিরে আসেন।

তাসনিয়া মিস ও জেনিফার মিস দুজনকে নিয়ে একবার ফেসবুকে লিখছিলেন কেউ কেউ। একজন আপা কমেন্টে জানালেন তাঁদের পরিবারের সবাই শিক্ষক। শিক্ষকদের নিয়ে এ রকম কৌতুক তিনি পছন্দ করছেন না। তিনিও সিদ্ধান্ত নেন—আর লিখবেন না।

সেই সিদ্ধান্তের পর বিকেলে দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। তাসনিয়া মিস আর জেনিফার মিস—দুজনের দুই স্টুডেন্ট বল্টু আর হিন্দোল ইশকুলে না গিয়ে সকাল থেকে রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টে বসে আছে।

যাওয়ার পর তাদের জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমরা সারা দিন এখানে বসে কী করছ?’

বল্টু বলে, ‘পড়াশোনা করছি।’

তারপর জানতে চাওয়া হয়, ‘কী পড়ছ?’

হিন্দোল জানায়, ‘মেসেজ পড়ছি, স্ট্যাটাস পড়ছি, কমেন্ট পড়ছি।’

আরও প্রশ্ন, ‘তোমাদের ইশকুল, পাঠ্যবই নেই?’

বল্টুর জবাব—‘তাসনিয়া মিস আর জেনিফার মিস দুজনের কেউই কোথাও নেই। ইশকুল আর পাঠ্যবই থাকলেই কি আর না থাকলেই কি!’

কী বলবেন বুঝতে না পেরে চলে আসেন। এরপরও বল্টু আর হিন্দোল গভীর মনোযোগ দিয়ে মেসেজ, স্ট্যাটাস আর কমেন্ট পড়তে থাকল।