স্পেনের উত্তরাঞ্চলের বার্গোস প্রদেশে অবস্থিত আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো নামের ছোট্ট গ্রামটি একেবারে নীরব জীবনযাপনের জন্যই পরিচিত। হাতেগোনা বাসিন্দা, অল্প অবকাঠামো—এখানে নেই কোনো রেস্তোরাঁ বা দোকান। গ্রামের একটি বারও সাধারণত খোলে না, আবার একটি বুদেগাও (ঐতিহ্যবাহী মদের ভান্ডার) আর খুলবে না।

তবে সপ্তাহে একদিন আশপাশের এলাকার ছন্দ বদলে যায়। কাছের একটি বেকারি থেকে আসা একটি সাদা গাড়ি গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে ঢুকে হাতে গোনা কয়েকজন বাসিন্দার কাছে রুটি পৌঁছে দেয়। কিছুক্ষণের জন্য হলেও এই যাতায়াত যেন নীরবতাকে নাড়িয়ে দেয়।

চলতি মাসে এই ছোট্ট গ্রামটি সাময়িকভাবে এক আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। আগামী ১২ আগস্ট আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পার হয়ে যাবে। ১৯৯৯ সালের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে এমন একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ প্রথমবারের মতো দেখা যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাদ্রিদভিত্তিক পদার্থবিদ ড. মারিয়া তেরেসা লোপেজ সানচেজ বলেন, ১৯১২ সালের পর এবারই প্রথম স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ কেবল ইউরোপের একটি সরু পথজুড়েই দেখা যাবে। আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামটি ঠিক সেই পথের মধ্যেই পড়বে।

সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের সুবিধা হিসেবে স্থানীয়ভাবে যে কারণটি সামনে এসেছে, তা হলো গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ। সোনালি গমখেত এবং নিচু টিলার বিস্তৃত প্রান্তরের কারণে পশ্চিম দিগন্ত দেখা যায় তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে। এর সঙ্গে যোগ হবে বিশেষ সময়টিও। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়টি হবে সূর্যাস্তের ঠিক আগে। ফলে অল্প কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুবার গোধূলির আবহ তৈরি হবে। পদার্থবিদ মারিয়া তেরেসা লোপেজ সানচেজের ভাষায়, ‘এটা যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে দুটি সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা।’

এক রাতেই আরেকটি বিরল দৃশ্যের কথাও বলা হচ্ছে। ওই রাতেই আকাশে দেখা যাবে বিখ্যাত পার্সেইড উল্কাবৃষ্টি। অর্থাৎ একই রাতে দুটি মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কোথা থেকে সূর্যগ্রহণ সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে—স্থানীয় বাসিন্দা সারা আলভারেজ রদ্রিগেজ সেটি জানিয়ে বলেন, ‘গুহার দিকে উঠে যান। সেখান থেকে সবকিছুই দেখা যায়।’

আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামে জন্ম নেওয়া সারা আলভারেজ ১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং জীবনের পুরো সময় এখানেই কাটিয়েছেন। প্রায় ৯ দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন কীভাবে গ্রামটির চেহারা বদলে গেছে। সারা বলেন, ১৯৫০-এর দশকে এই গ্রামে প্রায় ২০০ মানুষের বসবাস ছিল এবং তখন এখানে বেশ কয়েকটি ছোট দোকানও ছিল। তিনি জানান, গ্রামের মাছ বিক্রেতারা সাইকেলে করে আশপাশের গ্রামগুলোয় গিয়ে মাছ বিক্রি করতেন।

এদিকে ৭৩ বছর বয়সী রাউল গ্রান্দে রেভিয়া এই গ্রামেই জন্মেছিলেন, তবে ছোটবেলায় মাদ্রিদে চলে যান। স্মৃতিচারণায় তিনি বলেন, একসময় একজন ডাকপিওন গাধার পিঠে চড়ে গ্রামে চিঠি ও সংবাদপত্র পৌঁছে দিতেন। ডাকপিওন কখনো কখনো আধোঘুমে থাকলেও গাধাটি নিজেই জানত কোথায় থামতে হবে। এমনকি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা ছোট্ট ডাকঘরেও সে ঠিকই পৌঁছে যেত।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গ্রামের মানুষের জীবিকা ছিল বৃষ্টিনির্ভর কৃষি, সবজি চাষ, আঙুরের বাগান এবং গবাদিপশু পালন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কৃষিকাজ যান্ত্রিক হয়ে ওঠে। আশপাশে অন্য ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত ছিল। ফলে অনেকেই কাজের খোঁজে মাদ্রিদ, বিলবাও, বার্সেলোনাসহ বিভিন্ন শহরে চলে যান।

বর্তমানে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দার চেয়ে আশপাশের পাহাড়ি ঢালে চরতে থাকা ছাগলের সংখ্যাই বেশি। যেখানে একসময় শত শত গ্রামবাসী মাঠে কাজ করতেন, সেখানে এখন দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত সূর্যমুখীর খেত। তবে কিছু পরিবার আবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে গ্রামে ফিরছে।

রাউল গ্রান্দে তাঁর সঙ্গী, ছেলে, নাতি-নাতনি এবং বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে ফিরবেন বলে জানান। তাঁর ভাইও আসবেন তিন সন্তান, এক নাতি ও বোনকে নিয়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ জনের একটি দল হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা গ্রামের মোট জনসংখ্যার দ্বিগুণ। গ্রামের বর্তমান বাসিন্দা সংখ্যা মাত্র ১০ জন।

সারা আলভারেজের তথ্য অনুসারে, গ্রামের আরও অনেক বাসিন্দাই তাঁদের বন্ধু ও স্বজনদের আতিথ্য দেবেন। স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ভেনেজুয়েলা থেকেও অনেকে এই বিরল সূর্যগ্রহণ দেখতে গ্রামে আসবেন বলে জানা গেছে।

গ্রামটির কাছাকাছি প্যারাডর দে লেরমা হোটেলের অবস্থান। এটি একসময় লেরমার ডিউকের প্রাসাদ ছিল। সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে হোটেলটির সব কক্ষ ভাড়া হয়ে গেছে। কাস্তিয়া ই লেওন অঞ্চলের পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তা আলবের্তো বস্কে কোয়েলো বলেন, পুরো অঞ্চলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কাস্তিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব আবাসনই আগে থেকেই বুকড হয়ে গেছে। আসলে অনেক আগেই বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।’ তাঁর ভাষ্য, সূর্যগ্রহণ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা ‘সবচেয়ে পরিচিত জায়গা নয়, সবচেয়ে ভালো জায়গা’ খুঁজছিলেন। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য ছিল সর্বোত্তম পরিবেশে সূর্যগ্রহণ দেখা।

রাউল গ্রান্দে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পরিবার সূর্যগ্রহণ দেখতে স্পেনে আসার পরিকল্পনা করছে। মাদ্রিদে থেকে যেন তাঁরা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন, সে জন্য তিনি আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন—কেউ তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন কি না। তাঁর বিশ্বাস, স্পেনে সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য এটাই সেরা স্থান।

বার্গোস প্রদেশজুড়ে বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সূর্যগ্রহণ দেখতে নানা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তবে আভেইয়ানোসা দে মুয়োনোর স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা গ্রামের ওপরে থাকা গুহাগুলোর দিকেই ছুটবেন বলে বলা হয়েছে। উঁচুতে অবস্থিত এই গুহাগুলোকে এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগের আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে গুহাগুলোর গুরুত্ব শুধু দৃশ্য উপভোগের মধ্যেই সীমিত নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষ এখান থেকেই একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখেছেন। এমনকি গ্রামের এক সাবেক বাসিন্দার ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁর মৃত্যুর পর দেহভস্মও এখানেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে জায়গাটি গ্রামবাসীর কাছে গভীর আবেগ ও স্মৃতির অংশ।

আভেইয়ানোসা এমন একটি গ্রাম, যেটি সারা আলভারেজ কখনো ছেড়ে যাননি। সারা বলেছেন, তিনি কখনো গ্রামটি ছেড়ে যাবেন না। অন্যদিকে রাউল গ্রান্দে অন্য জায়গায় চলে গেলেও প্রায় প্রতিবছরই গ্রামে আসেন। প্রতি গ্রীষ্মে সারা আলভারেজের মেয়েরাও বাড়িতে আসেন।

পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দিন আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামটি আবারও মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠতে পারে। সেই রাতের অপেক্ষায় থাকছে কয়েকটি বিশেষ মুহূর্ত—যখন অল্প সময়ের ব্যবধানে দুবার নেমে আসবে গোধূলির অন্ধকার। আর স্পেনের সবচেয়ে উপেক্ষিত গ্রামগুলোর একটি কিছুক্ষণের জন্য বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে বলে প্রত্যাশা।