বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ কার হাতে? ফিফার ২১১ সদস্য দেশ, নাকি অর্থ নিয়ে হাজির হওয়া বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা? ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি পরিকল্পনা এই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর অংশীদারত্ব বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। ইউরোপীয় ফুটবলের কর্তাদের কাছে এটি সাধারণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ছিল না। তাদের আশঙ্কা ছিল, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিযোগিতাগুলোর ওপর সদস্য দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি অনলাইন বৈঠকে বসে উয়েফা। প্রায় ১৫০ কর্মকর্তা এতে অংশ নেন। তাদের সামনে দুটি পথ ছিল: ফিফার সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়া, অথবা ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামা। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন প্রথমে কথা বলেন। এরপর বক্তব্য দেন কোষাধ্যক্ষ ও সহসভাপতি শান্দোর চানি, ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী মার্ক বুলিংহামসহ ইউরোপীয় ফুটবলের পরিচিত পুরুষ কর্তারা।
তবে সভার গতিপথ বদলে দেন লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার। তিনি কূটনৈতিক প্রতিবাদ কিংবা আলোচনার প্রস্তাব দেননি। তার দাবি ছিল, ফিফার প্রতিযোগিতাগুলো সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। এরপর সামনে আসেন লিসে ক্লাভেনেস। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি বর্জনের পক্ষে অবস্থান নেন এবং প্রয়োজনে ফিফার নেতৃত্ব বদল ও পরবর্তী শাসনব্যবস্থায় কঠোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথও তুলে ধরেন।
উয়েফার ২১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটিতে নারী মাত্র দুজন। ম্যাকঅ্যালিস্টার ও ক্লাভেনেস সেই দুই সদস্য। ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহে তারা সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ হয়ে উঠলেন। দ্য অ্যাথলেটিকের সঙ্গে কথা বলা সভা সম্পর্কে অবগত একাধিক ব্যক্তির দাবি, সেফেরিন ছাড়া ম্যাকঅ্যালিস্টার ও ক্লাভেনেসের মতো কঠোর অবস্থান আর কেউ নেননি। উয়েফার বর্জনের সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর সংবাদমাধ্যমেও ফিফার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা করেন এই দুই নারী।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনাকে তারা ফুটবলকে ‘অর্থনৈতিকভাবে জিম্মি করার চেষ্টা’ হিসেবে দেখেছেন। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি আর এগোয়নি। তবে এটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা দুই নারীর গল্প নয়। ম্যাকঅ্যালিস্টার ও ক্লাভেনেস দুজনই সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার। মাঠের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পুরুষশাসিত ফুটবলের ক্ষমতাকেন্দ্রে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন তারা।
ম্যাকঅ্যালিস্টারের প্রশাসনিক লড়াই শুরু হয়েছিল খেলোয়াড়ি জীবনেই। ১৯৯২ সালে ওয়েলশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে নারী জাতীয় দলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে রাজি করানোর আন্দোলনে যুক্ত তিন নারীর একজন ছিলেন তিনি। খেলা ছাড়ার পর উচ্চশিক্ষা ও ক্রীড়া প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০২৩ সালে প্রথম ওয়েলশ প্রতিনিধি হিসেবে উয়েফার কার্যনির্বাহী কমিটিতে নির্বাচিত হন। সেখানে গিয়েই নারীদের জন্য আরেকটি আসন তৈরির উদ্যোগ নেন। দুই বছর পর সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা একটি থেকে বাড়িয়ে দুটি করা হয়। নতুন আসনে নির্বাচিত হন ক্লাভেনেস।
ক্লাভেনেসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ১৪ বছরের। নরওয়ের হয়ে ৭৩ ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ২০০৫ ইউরোর ফাইনালেও খেলেছেন। ফুটবলের সঙ্গে পড়াশোনা করেছেন আইন নিয়ে। ২০২২ সালে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের ১২০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ফুটবলের ক্ষমতাবানদের সামনে এমন সব প্রশ্ন তুলেছেন, যেগুলো অন্যরা প্রায়ই এড়াতে চেয়েছেন।
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি এখনো খুবই সীমিত। ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ সদস্যের মধ্যে নারী আটজন। তাদের ছয়জন এসেছেন মহাদেশীয় কনফেডারেশনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে রাখা নারী আসন থেকে। ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে মাত্র ১০টি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নারী। উয়েফার ২১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটিতে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসন মাত্র দুটি। এই কাঠামোর মধ্যে ম্যাকঅ্যালিস্টার ও ক্লাভেনেসের উত্থান তাই ব্যতিক্রম।
ঘটনার ছয় মাস আগে ব্রাসেলসে উয়েফার কংগ্রেসের এক নৈশভোজে ম্যাকঅ্যালিস্টারের সঙ্গে কথা হয় ইনফান্তিনোর। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, সুযোগ পেলে পরদিনের মঞ্চে তিনি কী নিয়ে কথা বলতেন। ম্যাকঅ্যালিস্টারের উত্তর ছিল, ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীর অভাব নিয়ে। পরদিন পুরুষে ভরা মিলনায়তনে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘অবশ্যই ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আমাদের আরও নারী প্রয়োজন।’
কয়েক মাস পর তারই বিতর্কিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেন ম্যাকঅ্যালিস্টার এবং ক্লাভেনেস। তাদের ভবিষ্যতে ফিফার বড় কোনো নেতৃত্বে দেখা যেতে পারে কি না, সেই প্রশ্নে তাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের উত্তর ছিল, ‘ফুটবল এখনো এর জন্য প্রস্তুত নয়।’ ফুটবল সত্যিই প্রস্তুত কি না, তার উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সেই জরুরি বৈঠক একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। যে ক্ষমতার ঘরে নারী ছিলেন মাত্র দুজন, প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠও হয়ে উঠেছিলেন তাঁরাই।