বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতানের আদর্শ ও কর্মদর্শনকে পাথেয় করে টানা ২১ বছর ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে অবৈতনিকভাবে চারুকলার শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছেন নড়াইলের গুণী চিত্রশিল্পী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক বিমানেশ বিশ্বাস। তার প্রতিষ্ঠিত অবৈতনিক আর্ট স্কুল ‘শিল্পাঞ্জলি’র মাধ্যমে হাজারো শিশুর সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ শিশুদের চারুকলা শিক্ষার সুযোগের অভাব দূর করতে ২০০৪ সালে তিনি দেশের প্রথম অবৈতনিক ভ্রাম্যমাণ আর্ট স্কুল চালু করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে নিজ বাড়িতে ‘শিল্পাঞ্জলি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর নড়াইল, যশোর ও খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একের পর এক ভ্রাম্যমাণ আর্ট স্কুল গড়ে তুলে চারুকলা শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।

নিজের এই উদ্যোগের প্রেরণা সম্পর্কে শিল্পী বিমানেশ বিশ্বাস বলেন, "আমার গুরু এস. এম. সুলতানকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে গ্রামের শিশুরাই দেশের প্রকৃত শক্তি এবং তাদের কাছে চারুকলা পৌঁছে দিতে হবে। সেই শিক্ষা থেকেই আমি এই কাজ শুরু করেছি। গ্রামের স্কুলগুলোতে চারুকলার শিক্ষক ছিল না, এখনও অনেক জায়গায় নেই। তাই শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আর্ট স্কুল গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি।"

২০১৬ সালে শিল্পাঞ্জলির স্থানীয় ও আদিবাসী শিশু-কিশোরদের নিয়ে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১০০ কেজি কাগজ ব্যবহার করে ২ হাজার ফুট দীর্ঘ ও ৩ ফুট প্রশস্ত একটি বিশাল চিত্রকর্ম আঁকা হয়, যার মোট আয়তন প্রায় ৬ হাজার বর্গফুট। টানা পাঁচ বছর ধরে শিশুরা এই ক্যানভাসে গ্রামের জীবন, কৃষিকাজ, প্রকৃতি, উৎসব, খেলাধুলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও লোকসংস্কৃতির নানা চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালে এই বিশাল চিত্রকর্মটির ৪০০ ফুট অংশ ডিজিটাল প্যানেল আকারে তৈরি করে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী শুরু হয়। নড়াইল ও যশোরের আগদিয়া, মালিয়াট, ভবানীপুর, গোবরা, বাকড়ী, সীতারামপুর, মুলিয়াসহ অন্তত ২৭টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা প্রায় ১০ হাজার দর্শনার্থী উপভোগ করেছেন।

এই দীর্ঘ পথচলায় শিল্পী বিমানেশ বিশ্বাসের সহধর্মিণী মমতা বিশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে আদিবাসী শিশুদের জন্য নিয়মিত একবেলার খাবারের ব্যবস্থা করে তিনি এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করেছেন। অনুভূতি প্রকাশ করে মমতা বিশ্বাস বলেন, "এই শিশুরা আমার নিজের সন্তানের মতো। তাদের মুখে হাসি দেখাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।"

গত দুই দশকে বিমানেশ বিশ্বাস নড়াইল, যশোর ও খুলনার বেতবাড়িয়া, বড়েন্দা, চণ্ডীতলা, পঙ্কবিলা, হাটবাড়িয়াসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় মোট ১৬টি অবৈতনিক ভ্রাম্যমাণ আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। মন্দিরের বারান্দা, বৃদ্ধাশ্রম কিংবা গ্রামের উঠানে বসেই চলছে চারুকলার এই পাঠ। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাশ্রমে বেসিক ড্রইং, রঙের ব্যবহার ও সৃজনশীল চিন্তার ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন।

প্রদর্শনী আয়োজনে যুক্ত শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবক সৌমিত্র মোস্তবী এবং আলোকচিত্রী মাসুম জব্বারী জানান, ডিজিটাল প্যানেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।