দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহনশীলতা, মুক্তবুদ্ধি, পরমতসহিষ্ণুতা, নৈতিকতা এবং ন্যায্যতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি মনে করেন, সমাজের বিদ্যমান অস্থিরতা, বৈষম্য ও দুর্নীতি দূর করতে এই চর্চাগুলো অপরিহার্য।

রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি আয়োজিত ‘শান্তির জন্য দর্শন’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইউজিসির জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, "দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যয়ন করে এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নেতৃত্ব দেয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহনশীলতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকেরা সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হতে পারেন। এর ফলে দুর্নীতি, বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।"

সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, "দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কারণে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিপীড়ন, বৈষম্য ও অন্যায়ের শিকার হয়েছেন—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমাশীলতা, সংলাপ ও ন্যায়ভিত্তিক পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একটি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা।"

শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে ইউজিসির উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি জানান, "শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে ইউজিসি অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে সফট স্কিল, নৈতিকতা ও মূল্যবোধবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ মডিউল প্রণয়নের কাজও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।"

উন্নয়নের দর্শন প্রসঙ্গে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, "দেশের উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; উন্নয়নের দর্শন হতে হবে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক। মূল্যবোধহীন উন্নয়ন সমাজে বৈষম্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। তাই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নয়; বরং এটি একজন শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল নাগরিক, নৈতিক নেতৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি এবং বিশ্বমানব হিসেবে গড়ে তোলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।"

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্তিনির্ভর সংলাপ, সমালোচনামূলক চিন্তাচর্চা, নৈতিক শিক্ষা এবং আন্তবিষয়ক গবেষণার সংস্কৃতি জোরদার করতে তিনি দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুলওলায়ীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, ভারতের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সন্তোষ কুমার পাল, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া।

দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের খ্যাতিমান শিক্ষক, গবেষক ও দর্শনচিন্তাবিদগণ অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে শান্তি, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমকালীন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দর্শনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাপত্র উপস্থাপন ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।