ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ, স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর চারপাশের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও অদম্য সাহসের পরিচয় দিয়েছে গাজার তরুণ প্রজন্ম। মৃত্যু আর সর্বগ্রাসী ধ্বংসের মুখেও থেমে থাকেনি ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের যাত্রা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক (তাওজিহি) পরীক্ষায় সব বাধা ডিঙিয়ে শিক্ষার্থীরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, যা প্রমাণ করে সংগ্রামই ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার মূল প্রেরণা।

গত ২৪ জুলাই এ বছরের তাওজিহি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের মুসা পরিবারে নেমে আসে বাঁধভাঙা আনন্দ। ইসরায়েলের অবিরত হামলা ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও এই পরিবারের তিন ভাইবোন—সামা, আবদুল্লাহ ও নাদা অসাধারণ ফলাফল করেছে। বোন সামা সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে ভাই আবদুল্লাহ অর্জন করেছে ৯৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বোন নাদা পেয়েছে ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ নম্বর।

সামা জানান, এই জয়ের পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। মনস্তাত্ত্বিক চাপ কাটিয়ে কেবল পরিবারকে খুশি করতে এবং দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাঁচাতে তারা এই অসাধ্য সাধন করেছে। তাদের মা হিন্দ মুহান্না ও বাবা বাড়িতে শিক্ষকদের এনে প্রতিবন্ধী সন্তানদের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করেছিলেন, যার ফল আজ তারা পেয়েছে।

ফিলিস্তিনের শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ বারহামের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী তাওজিহি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস। শিক্ষামন্ত্রী জানান, "এ বছর পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল এমন ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছে ইসরায়েল।"

জাতিসংঘের হিসাব মতে, গাজার ৯৭ শতাংশের বেশি স্কুল আগুনে ও বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত অথবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। চরম প্রতিকূলতার মুখে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বীরের মতো লড়াই করেছেন শিক্ষকরাও। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বোমার আতঙ্ক আর মেঝের পাটিতে বসিয়ে তাওজিহি পরীক্ষার্থীদের গণিত পড়াতেন শিক্ষিকা হানা আল-সায়েদ। সেখানে কোনো চেয়ার বা টেবিল ছিল না। স্বজন হারানো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক শক্তি জোগানোর পাশাপাশি অংকের হিসাব শিখিয়েছেন তিনি। হানা জানান, শত কষ্টের পরও ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাস করে, শিক্ষাই তাদের অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরানোর একমাত্র পথ।

তবে এই সাফল্যের আনন্দ অনেকের জন্যই ছিল বেদনাময়। মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের তলা আবু সুক্কার শৈশবে মাকে হারিয়েছিল। চলমান যুদ্ধে সে তার বাবা, ভাই, বোন ও চার ভাগ্নে-ভাগ্নিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। চাচার আশ্রয়ে থেকে শোক চেপে পরীক্ষা দিয়ে তলা ৮৬ শতাংশ নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের সনদ হাতে পেয়ে অশ্রুসিক্ত তলা বলে, “পাস করেছি সত্যি, কিন্তু আজ এই আনন্দ ভাগ করার জন্য আমার বাবা বা পরিবারের কেউ বেঁচে নেই।”

প্রিয়জন ও বাসস্থান হারিয়েও গাজার তাওজিহি পরীক্ষার্থীদের এই গল্প বিশ্ববাসীকে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের এক নতুন পাঠ দিচ্ছে। তারা প্রমাণ করেছে, গাজার সন্তানদের কাছে শিক্ষা কেবল একটি পরীক্ষা নয়, বরং আশা আর স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।